একজন শতায়ু শিক্ষক আয়ুব হোসেন

আজিজুর রহমান, চৌগাছা:  আয়ুব হোসেন। বয়স ১’শ ১১ বছর। পেশায় অবসরপ্রাপ্ত  শিক্ষক। শিক্ষকতায় যার কেটেছে ৬০ বছর। আলোকিত মানুষ গড়ার এই কারিগর আজও সুস্থ্য আছেন। প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। বয়স শতবছর পেরিয়ে গেলেও শরীর ভেঙে পড়েনি। তার হাতে শিক্ষা নিয়ে সফল হয়েছেন অনেকে। জীবন সায়াহ্নে আয়ুব হোসেনের তৃপ্তি শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তন নিজের চোখেই প্রত্যক্ষ করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের ছোঁয়া তিনিও পেয়েছেন। ১৭ টাকা মাসিক বেতন চাকরি শুরু করলেও বর্তমানে অবসরকালীন ভাতা পান ৫ হাজার ৫৯০ টাকা। অবসরকালীন ভাতা বৃদ্ধির জন্য তিনি প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার হুদাপাড়া গ্রামের মৃত আজিবর বিশ্বাসের ছেলে আয়ুব হোসেন। তার জন্ম ১৯০৭ সালে। তবে তারিখটা এখন আর মনে নেই। ১৯৩০ সালে চৌগাছা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন ১৭ টাকা মাসিক বেতনে। সেখানে ২৯ বছর চাকরি করে ফুলসারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বদলি হন। পরে দিঘলসিংহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হন। সেখান থেকেই ১৯৯০ সালে অবসরে যান।

১’শ ১১বছর বয়সেও পায়ে হেটে বাড়ি থেকে তিন-চার কিলোমিটার দূর চৌগাছা শহরে যাতায়াত করেন আয়ুব হোসেন। পায়ে হেটেই শহরময় ঘুরে বেড়ান। বয়সের ছাপ থাকলেও নুয়ে পড়েনি শরীরটা। ছোটখাট গড়নের এই বর্ষিয়ান শিক্ষক কানে শোনেন স্পষ্টভাবে। তবে চোখের সামান্য সমস্যা থাকলেও চশমা ছাড়া ভালোই দেখেন। সর্বোপরি তিনি সুস্থ্য এক পৌঢ়। অনেকের কাছেই এটি অবাস্তব মনে হতে পারে।
শুক্রবার (১২ অক্টোবর) চৌগাছা শহরে কথা হয় শতায়ু আয়ূব হোসেন স্যারের সাথে। বলছিলেন ১৯৩০ সালে শুরু করেছিলেন শিক্ষকতা। সে সময়ের এন্ট্রাস পাশ আয়ূব হোসেন বর্তমান চৌগাছা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘ ৬০ বছর চাকরি জীবন শেষে ১৯৯০ সালে অবসরে যান। প্রাথমিক শিক্ষা শুরুর কথা ঠিকমত বলতে না পারলেও ব্রিটিশ-ভারতের কলকাতা থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন বলে জানান। এরপর ১৯৩০ সালে বর্তমান চৌগাছা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ১৭ টাকা বেতনে চাকুরী শুরু করেন। জানালেন ১৭ টাকা মাসিক বেতন হলেও তখন বেতন দেয়া হতো প্রতি তিন মাস পরপর। আর বেতন তুলে এনে দিতে অফিসের পিওনকে দিতে হতো এক টাকা করে। প্রথম জীবনের ছাত্রদের অনেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার অনেকে সফল হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু সেই ছাত্রদের প্রিয় শিক্ষক তিনি বেচে আছেন।

আয়ুব হোসেন জানান, দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি ডিভাইন গ্রæপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হাসানুজ্জামান রাহীন ও তার ভাই বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ম সচিব নাজমুজ্জামান শাহীনসহ অনেকেই আমার ছাত্র ছিলো। রাহীন শিল্পপতি হয়েছে। এলাকায় কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠান করেছে। ফলে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেকের। বেকারত্ব ঘুচে যাওয়ায় চৌগাছা শহরে চুরি ডাকাতি কমেছে। এছাড়াও খুলনার সিভিল সার্জন ডা. এএসএম আব্দুর রাজ্জাক, চৌগাছা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম হাবিবুর রহমান, চৌগাছার সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিএম হাবিবুর রহমান প্রমুখ চৌগাছার জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা তার ছাত্র ছিলেন বলে দাবি করেন।
তিনি আরও জানান, অবসরে যাওয়ার সময়ে বেতন ছিল ৩ হাজার ৭২ টাকা। তিন স্ত্রীর মধ্যে বর্তমানে সর্বশেষ স্ত্রীসহ ৬ কন্যা ও তিন ছেলে জীবিত আছে।
নিজের শরীরের বিষয়ে আয়ুব হোসেন বলেন, চোখে একটু সমস্যা। তাছাড়া এখনো কানে ভালোভাবে শুনি। বাড়ি থেকে তিন-চার কিলোমিটার হেটে চৌগাছা শহরে যাতায়াত করি। শরীরে তেমন কোন সমস্যা নেই। অবসরকালে এককালীন ১ লাখ ৫৫ হাজর ২০০ টাকা পেয়েছিলাম। অবসরকালীন ভাতা বর্তমানে বেড়ে ৫ হাজর ৫৯০ টাকা হয়েছে।
অবসর ভাতার টাকা পেয়ে কেমন লাগে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খুবই ভালো লাগে। তবে আর একটু বেশি হলে ভালো হতো। যে টাকা পাই তা আমার অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসায় খরচ হয়ে যায়। তবুও ভাতা বৃদ্ধির জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।