তবিবর সরদার প্রকৃত রাজনীতিবিদ ছিলেন

সাজেদ রহমান: দেখতে দেখতে চলে গেল ৯টি বছর। এই ৯ বছরে অনেকে তাঁকে মনে রেখেছেন। অনেকে হয়তো মনে রাখেনি। তবে শার্শার মানুষের কাছে এখনও তিনি জীবন্ত। তাঁকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা এখনও তাঁকে স্মরণ করেন। শ্রদ্ধ এবং ভালোবাসায় হৃদয় থেকে তাঁর নাম উচ্চরণ করেন। তাঁর স্মৃতি রোমান্থ করেন।

বলছিলাম তবিবর রহমান সরদারের কথা। তাঁর নামের আগে বহু বিশেষন দিয়ে লেখা যায়। কিন্তু সেসবে গেলাম না। সারা জীবন আওয়ামীলীগের রাজনীতি করেছেন। সংসদ সদসও নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু আমার কাছে তাঁর বড় পরিচয় তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধ। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে বেনাপোলের বিপরীতে পেট্রাপোলে ক্যাম্পের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়টা বললাম একারণে, একজনের অনুপস্থিতিতে কেউ না কেউ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি হবেন, সংসদ সদস্য হবেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যাবে না। ৬ দফার আন্দোলনে কিংবা উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া যাবে না। ২০১০ সালের ৩ এপ্রিল বার্ধক্যজনিতকারণে মারা যান।

একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদ:
তবিবর রহমান সরদার ১৯৩২ সালের ১ মে যশোর জেলার শার্শা উপজেলার বারিপোতা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। মরহুম মতিয়ার রহমান সরদার ও মরহুমা রাবেয়া খাতুনের জ্যেষ্ঠ্য পুত্র তবিবর রহমান সরদার এর বাল্যকাল কেটেছে বারিপোতা গ্রামে। শিক্ষার হাতেখড়ি নাভারণ বুরুজবাগান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পন্ন করেন মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা মেট্রিকুলেশন। এরপর খুলনার দৌলতপুর ব্রজলাল (বি,এল) কলেজ থেকে সম্পন্ন করেন উচ্চ মাধ্যমিক ও বিএ পরীক্ষা। ছাত্রজীবন থেকে জড়িয়ে পড়েন আওয়ামী রাজনীতির সাথে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ব্যবসা দিয়ে শুরু করেন কর্মজীবন। কিন্তু মানুষের কল্যাণ ও রাজনীতি তাঁকে খুব টানে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের শার্শা থানার আহবায়ক এবং মহকুমা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত যশোর জেলার আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং পরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৫৮ সালে নির্বাচিত ইউপি সদস্য হিসেবে শুরু হয় তার জনপ্রতিনিধিত্ব। এরপর ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন ও ৬৯ গণঅভ্যুথানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের ক্ষনজন্মা এক রাজনৈতিক শহীদ মশিয়ুর রহমানের স্নেহাস্পদ তবিবর রহমান সরদার ১৯৭০ সালে এমসিএ (গণ পরিষদ সদস্য) হিসেবে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে নির্বাচিত হোন। স্বাধীনতা পরবর্তী শার্শা উপজেলার প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোন। বাংলাদেশের সপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যশোরের এক সমাবেশে তাকে ‘বাংলায় মুজিবর শার্শায় তবিবর’ খ্যাত উপাধি দেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই তিনি ভারতে চলে যান এবং সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। পেট্রাপোলে মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটিং করতেন। তাদের দেখভাল করতেন। শরর্নার্থী শিবিরের খাবার, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। আসলে বলতে হয় এই রণসৈনিক তার সঠিক কর্ম ও স্থানটি খুজে পান ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাজউদ্দীন আহমেদের সাথে যশোর টাউন হল ময়দানের এক জনাকীর্ন সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩, ৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শার্শা এলাকায় বহু স্কুল-কলেজ এবং মাদ্রাসা তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। বীরশ্রেষ্ঠ নুর মোহাম্মদ কলেজ, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মহিলা কলেজ, নাভারন ডিগ্রি কলেজ, বুরুজবাগান উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ধলদা টিআরএস (তবিবর রহমান সরদার) মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বুরুজবাগান গালর্স হাইস্কুল, গোর্কণ দাখিল মাদ্রাসা থেকে শুরু করে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই তিনি তৈরি করেছেন ও অনুদান দিয়েছেন।
২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়ার কারণে তিনি মনোকষ্ট পেয়েছিলেন। তারপরও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরে কাজ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি যে রাজনীতি ধারন করে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন, মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত তা থেকে তিনি বিচ্যুতি হননি।
আওয়ামী লীগের সবচেয়ে দুঃসময় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘাতকরা হত্যার পর তিনি জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, এর হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত তিনি মাথার চুল কাটবেন না। তিনি তা রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে হজব্রত পালন করতে গিয়ে ধর্মীয় কারণে তিনি মাথার চুল কেটেছিলেন এবং পরবর্তীতে তা আবারও রাখেন। অনেক দিন ধরে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের কান্ডারির মতো ছিলেন। আর সেই সময় দলে গ্রæপিং থাকলেও তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়। নতুন প্রজন্মের আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই জানেন না তবিবর রহমান সরদার কেমন মানুষ ছিলেন। কারণ, তিনি যাঁদের সাথে রাজনীতি করেছেন, তাঁদের অনেকে গত হয়েছেন বেশ আগেই। তবে যশোরের আওয়ামী লীগ শুধু নয়, প্রতিটি দলের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। আজন্ম রাজনীতিক এই ব্যক্তি যেমন ছিলেন বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী অন্যদিকে তিনি ছিলেন বাক সংযমী। তিনি চাইতেন কেউ যেন তার কথায় কষ্ট না পান। সেজন্য তিনি সর্বদা ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। প্রয়াত মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানসহ বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ প্রমুখ রাজনীতিকদের সাথে তার ছিল সদ্ভাব। তাদের কাছ থেকে যেমন পেয়েছেন সম্মান, তেমনি আজীবন তাদের সম্মান করেছেন।

মাঝেমধ্যে তিনি আমার কাছে বাসা থেকে ফোন করতেন। বলতেন, একটু আমার বাসায় ঘুরে যাও। গল্প করব। সময় সুযোগ পেলে যেতাম। ২০০৭ সালের ৮এপ্রিল তিনি বললেন, আমার বাসায় তোমাকে আসতে হবে। সেদিন প্রায় ২ ঘণ্টা তার সঙ্গে কথা হলো। বললেন, ছোটবেলা স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে যখন কলেজে ভর্তি হয়েছি, তখন রাজনীতি আমাকে টানে। প্রথম প্রথম মিছিলে যেতাম, পরে দেখলাম শুধু মিছিল নয়, আমাকে প্রগতিশীল এই দলটি করতে হবে। এর পর পুরো সময় রাজনীতির জন্য সময় দিতাম। পরে আওয়ামী লীগে যোগদান করি।
১৯৯৬ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রবীণ এই নেতা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মনোনীত হন। ২০০০ সালের ২৩মার্চ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সুন্দরবনের একটি দুর্নীতি তদন্ত করতে সরেজমিন খুলনায় আসেন এবং সুন্দরবনের যেসব এলাকা থেকে অভিযোগ গেছে সংসদীয় কমিটির কাছে, সেসব এলাকা পরিদর্শন করেন। সেই কমিটির সঙ্গে আমার যাবার সুযোগ হয়েছিল, শুধু তাঁর কারণে। কিন্তু দুর্নীতির ব্যাপারে তিনি ছিলেন সোচ্চার ও আপোসহীন। তা সেই সময় বুঝেছিলাম। তাই তো দেখা যায়, বর্তমান সময় একবার এমপি হয়ে অনেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। কিন্তু তিনি বারবার এমপি হয়েও কিছু করতে পারেননি। সৎ ব্যক্তি হলে এটা সম্ভব। ঢাকার এমপি হোস্টেলে তার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে ঢুকলেই অনেকে বুঝতেন সরদার কেমন জীবনযাপন করেন। অনেকে তার সঙ্গে চলতেন, তারা সরদার চাচাকে বলতেন, আপনি কিছু করতে পারলেন না। তিনি তাদের উদ্দেশে বলতেন, আমি সৎ থাকতে চাই। অতকিছু আমার প্রয়োজন নেই।
শার্শার মানুষের কাছে তিনি সরদার চাচা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আমিও চাচা বলে ডাকতাম। কেমন মানুষ ছিলেন তবিবর রহমান সরদার? তা নির্ধারণ করবে ইতিহাস। তবে এটুকু বলা যায়, ছাত্রলীগের মাধ্যমে তার রাজনীতিতে প্রবেশ এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি এক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। এর মুল্যায়ন একদিন হবেই।

লেখক: সভাপতি, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জেইউজে)।