কোচিং বাণিজ্যের অপছায়া

আরএম খায়রুল উমাম: ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের ভালো বিষয়গুলো আমরা আমাদের এখানে গ্রহণ করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। তবে ব্রিটিশদের খারাপ বিষয়গুলো এখনও চলমান। একই স্টেশনে তিন বছরের বেশি চাকরিরত সরকারি কর্মচারীদের বদলির বিধানের ভালো দিকটা আমরা ভুলে গিয়েছি। একই স্টেশনে দীর্ঘ অবস্থানের ফলে যে প্রভাব সৃষ্টি হয়, তা আমাদের ভাবনার মধ্যে নেই। স্বাধীন দেশে স্বজাতির শাসন ব্যবস্থায় নতুন ভাবনায় ব্রিটিশদের তিন বছর পরপর কর্মচারীদের বদলির বিধান সাধারণভাবে রহিত হয়ে যায়। চাকরিজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই স্থানে থাকার সুযোগ পেয়ে যায়। একজন চাকরিজীবীর এই সুযোগের ফলে যে প্রভাব সৃষ্টি হয়, তাতে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেও সরকার নীরবই থাকে। জাতীয় সমস্যার সৃষ্টি হলে শুধু সরকার নড়েচড়ে বসে। কর্মচারীদের বদলির হুমকি দেয়। সরকারের অপছন্দ হলে কিছু চাকরিজীবী বদলিও হয়। অপছন্দের অনেকেই অল্প সময়ে পছন্দের ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে যায়। আমাদের দেশের রাজনীতির চিত্র যেন এমনই।

রাজধানী ঢাকায় অনেক শিক্ষকের কোচিং বাণিজ্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পাশাপাশি সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোচিং বাণিজ্যে নিয়োজিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগের কথা পত্রিকান্তে প্রকাশ পেয়েছে। সরকার কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে নিজেদের উদ্যোগ বাস্তবায়নে নিবেদিত হবে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় থাকলেও বিষয়টি গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ কোচিং বাণিজ্যের ফলে সারাদেশের মানুষ এখন নিজেদের অসহায়ত্বের কথা বলে চলেছে। শিক্ষা নিতে কোথাও আলোচনা উঠলেই তা কোচিংয়ের আলোচনায় রূপান্তরিত হয়। অভিভাবক-শিক্ষার্থী সবাই সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন। বিদ্যালয় শিক্ষার চেয়ে কোচিং শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিক্ষা ব্যবস্থাটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না গেলেও কোচিংয়ে হাজিরা দিতে ভুল করে না। পরিবেশ এমন পর্যায়ে উপনীত, এখন অভিভাবকরা সুযোগ পেলেই বিদ্যালয়ে সময় কমানোর

দাবি জানাচ্ছেন। সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটা ট্র্যাকে আনার জন্য যখন বিদ্যালয়ে সময় বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করছে, তখন অভিভাবকরা বিপরীত দিকে হাঁটতে চাইছেন।

দেশে কোচিং বাণিজ্যের প্রসারে বর্তমানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক সময় এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এক ঘণ্টার একটা ক্লাসে ৬০ জন শিক্ষার্থীকে একজন শিক্ষকের পক্ষে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার মতো কঠিন কাজটা দেশব্যাপী চলে। এখানে শিক্ষকের শূন্যপদ বিষয়টাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। আর প্রতিষ্ঠানপ্রধানের শূন্যতা কোচিং বাণিজ্যের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে চলেছে। শুধু যশোর জেলায় ১২৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮৭টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সরকারি হাই স্কুল ও কলেজগুলোতেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধান না থাকলে কোন প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলে, সে বিষয়টা ভেবে দেখা প্রয়োজন। এটা হঠাৎ সৃষ্টি হয়েছে- মনে করার কোনো কারণ নেই। বছরের পর বছর ধরে চলমান। কোনো কারণে একবার পদ শূন্য হলে তা পূরণ হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, বিশেষ করে মফস্বলের প্রতিষ্ঠানগুলোতে। পরিবেশ পরিবর্তন করে অবস্থার পরিবর্তনের কার্যক্রম প্রয়োজন। সরকার এদিকে নজর দিতে চায় বলে মনে হয় না। সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে অনেক কিছু করছে বা করতে চাইছে কিন্তু সমস্যার মূলে যাওয়ার সদিচ্ছা প্রকাশ করছে না।

শিক্ষকরাও সামাজিক মানুষ। সমাজ কী চায় এবং কোন পথে পরিচালিত হচ্ছে, তারা তা গভীরভাবে অনুভব করেন। নিজেদের সামাজিক অবস্থান দেখতে চেষ্টা করেন। কয়েক দিন আগে শিক্ষা সংক্রান্ত এক গোলটেবিল বৈঠকে একজন শিক্ষক বলেন, ৩৬ বছর ধরে সহকারী শিক্ষকই আছেন; আজও শিক্ষক হতে পারেননি। আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে? একজন ব্যক্তির চাকরির জীবনকাল কত? তার ৩৬ বছর যদি সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনেই কেটে যায়, তাহলে সে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে এবং জাতি তার কাছে কী আশা করতে পারে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বরং এর ধারাবাহিকতায় ব্যক্তিটি অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বঞ্চনার শিকার হয়ে সমাজে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। একজন ক্ষুধার্ত শিক্ষক, একজন সামাজিক অবহেলিত শিক্ষক কি আমাদের শিশু-কিশোরদের সুশিক্ষা দিতে পারেন? সমগ্র জাতি আজ শিক্ষক সমাজের কাছে এটাই চায়। কিন্তু কেউ নিজেকে সহকারী শিক্ষকের জায়গায় বসিয়ে চিন্তা করতে চান না যে, সমস্যা কোথায় এবং সমাধান কোন পথে! আমাদের যারা নীতিকৌশল প্রণয়ন করেন, তারা অন্তত বিষয়টা ভেবে দেখতে পারেন।

আমাদের শিক্ষকরা এক সময় প্রাইভেট পড়াতেন না। এখনও অনেক শিক্ষক আছেন যারা এ পথে হাঁটেন না। অতীতে আমাদের শিক্ষার্থীরা গুরুগৃহে অবস্থান করে শিক্ষা লাভ করত। এরই ধারাবাহিকতায় এক সময় শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের বাড়ি গিয়ে নিজেদের দুর্বলতা দূর করার পাঠ গ্রহণ করত। তারপর বিত্তবানরা তাদের সন্তানদের সুশিক্ষা প্রদানে শিক্ষকদের নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা শুরু করেন। এভাবেই শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষকদের অর্থের একটা যোগ শুরু হয়ে যায়। এই অর্থযোগই শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনির বাজার সৃষ্টিতে উদ্যোগী করে তোলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দল ভারী হতে শুরু করে এবং আজ মহিরুহে পরিণত হয়েছে। নব নব কৌশলের পথপরিক্রমায় তা এখন কোচিং বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে। আগামীতে আরও উন্নত কৌশল আমাদের সামনে এলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। আমাদের স্বাস্থ্যসেবার অতীতের দিকে তাকালেও শিক্ষকদের মতো একটা ধারাবাহিকতা পাওয়া যাবে। আমাদের চিকিৎসকরা প্রথম পর্যায়ে নিজ গৃহে তারপর হাট-বাজার থেকে চেম্বার হয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। এখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের যুগ। কেউ হার্ট, কেউ কিডনি, কেউ রক্ত, কেউ দাঁত, কেউ নাক-কান-গলা, কেউ বুক, কেউ পেট- শরীরের প্রতিটা অঙ্গের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন। মানুষ তাদের প্রয়োজনমতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের পুরো বিবর্তনের ফলে চিকিৎসাসেবা অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষ এ ব্যবস্থা বহুলাংশে মেনে নিয়েছে। তাই আশা করা যায়, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক সময় চিকিৎসকদের মতোই বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের দেখা যাবে।

পাবলিক পরীক্ষার ফল বের হলে আঞ্চলিক ও জাতীয় পত্রিকায় শত শত মেধাবীর যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়, তার এক লাখে একজনকে পাওয়া যেতে পারে, যে শিক্ষক হিসেবে নিজেকে দেখতে চায়। পেশাকে ভালো না বাসার ফলে পেশার প্রতি আন্তরিক হতে পারছেন না অনেকেই। এ জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা আজ হুমকির মুখে। কোচিং বাণিজ্য পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে গিলে খেতে বসেছে। গাইড বই সোহাগা হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষা-সংশ্নিষ্টরা, ক্ষমতার বলয়ের মধ্যের মানুষেরা এবং শিক্ষাবিদরা কেউই সমস্যার গোড়ায় গিয়ে সমাধানের পথে না গিয়ে সব অব্যবস্থা, দুর্নীতি সহ্য করে শুধু দায়িত্ব পালনের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে চান। রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত পেশাজীবীরা সরকারকে আরও বেশি বিপথগামী করে তুলেছে। সরকার বদলিকেই কোচিং বাণিজ্য রোধের পথ হিসেবে বিবেচনা করছে। সরকারি চাকরিতে তিন বছর পর বদলি সর্বত্র কার্যকর করলে অনেক পেশাজীবীই স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হবে না। কোচিং বাণিজ্যের চেয়ে অনেক অনেক ক্ষেত্রে জনগণ উপকৃত হবে। শিক্ষানীতির সুপারিশ কার্যকর করে শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন করে শিক্ষকদের দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় চলমান দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা হোক। সরকারের অঙ্গীকারকৃত শিক্ষকদের পৃথক বেতন কমিশন গঠন করা হোক। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হোক। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতিটা পদক্ষেপে শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হোক। পরিশেষে শিক্ষক সমাজের যারা কোচিং বাণিজ্যে লিপ্ত, তাদের কাছে নিবেদন, অপ্রাপ্তির বেদনা থেকে, সমাজের অবহেলা থেকে জাতির ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় না করিয়ে নিজ দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেই আগামীর আছে নিজেদের পাওনা বুঝে নেওয়ার পথ পরিস্কার করুন।

লেখক: সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)।

সূত্র: সমকাল