‌’ওরা আমার ভাইয়ের মাথার দাম দিতে চায়’

প্রতিবেদক, মনিরামপুর (যশোর): ‘টাকা চাই না, আমি আমার ভাই হত্যার বিচার চাই। কয়টা টাকা দিয়ে ওরা আমার ভাইয়ের মাথার দাম দিতে চায়। আমরা গরিব হতে পারি, তার মানে এই না, এই টাকা দিয়ে চাল কিনে খেতে হবে।’ কান্নাজড়িত কন্ঠে কথাগুলো বলছিলেন, গত বৃহস্পতিবার যশোরের মনিরামপুরে হানিফ পরিবহনের বাস চাপায় নিহত আশিকুর রহমানের ভাই আতাউর রহমান। শনিবার রাতে সমঝোতা বৈঠকে বাসচাপায় নিহত মেধাবী দুই স্কুলছাত্র আশিকুর রহমান ও আল-আমিনের পরিবারকে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে আতাউর রহমান এসব কথা বলেন।

মামলার বাদী আতাউর রহমান আর্তনাদ কন্ঠে জানান, টাকা দিয়েই কি সব সম্ভব, আমি আমার ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর বিচার চাই। আতাউর রহমান তার ফেসবুক আইডিতে ভাইয়ের মৃত্যু ও হানিফ পরিবহনের মালিকপক্ষের টাকা প্রদান নিয়ে আবেঘন পোস্ট দিয়েছেন। তিনি রোববার সন্ধ্যা ৭টা ২৭ মিনিটে প্রথম পোস্টে লিখেছেন, ‘লাশ লাগবে লাশ হানিফ পরিবহনের বাটা লাশ প্রতি পিস ১ লাখ ১০ হাজার টাকা।’ এরপর ৩ মিনিটের ব্যবধানে তিনি আরও লিখেছেন,‘একবার ভাবুন তো আপনার কোনো নিকট আত্মীয় লাশ নিয়ে যখন আপনার সামনে দেন দরবার হয় তখন কেমন লাগে, খোদা এই পরিস্থিতি ও দেখতে হয়েছে আমাকে।’ এর ১ মিনিটের ব্যবধানে তিনি লিখেছেন, ‘ওরা টাকা নিয়ে আসছে তোকে কিনতে, একবারও বলল না যে ড্রাইভার এটা করলো তার কী বিচার করলেন’।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি বলেন, সন্তান হারানো দুই পরিবারের অফুরন্ত ক্ষতি লাঘব করার ক্ষমতা কারো নেই। তারপরও নিহত দুই পরিবারের স্বজন, হানিফ বাস মালিকের পক্ষে দুই ম্যানেজার, যশোর ২২৭ শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক মোর্তজা হোসেন, সহ-সম্পাদক মিন্টু গাজী, সহ-সভাপতি হাসানসহ স্থানীয় অনেককে নিয়ে ওই রাতে ধলিগাতী হাইস্কুলে বৈঠক হয়। সেখানে হানিফ বাস কর্তৃপক্ষ দুই লাখ ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়ে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বিনিময়ে মামলা তুলে নেয়া হবে বলেও হানিফ পরিবহনের মালিক পক্ষ ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ দাবি করেছেন। বৈঠকে উপস্থিত যশোর ২২৭ শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক মোর্তজা হোসেন বলেন, নিহত দুই পরিবারের অভিভাবক, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে সমঝোতার মাধ্যমে এ অর্থ প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। এক প্রশ্নের জবাবে হানিফ পরিবহনের মালিক পক্ষের দ্বীন ইসলাম দিনু বলেন, সমঝোতা হওয়া মানেই মামলাসহ সব বিষয়গুলির সমাধান হওয়া। এছাড়া মামলা প্রত্যাহারের শর্তে এফিডেপিটের মাধ্যমে অর্থ প্রদান করা হবে বলেও তিনি জানান।

এদিকে হানিফ পরিবহন চাপায় দুই মেধাবি স্কুলছাত্রের জীবনের মূল্য ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় নির্ধারিত হওয়ার বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় সর্বমহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নিহত আশিকুরের ভাই আতাউর আরও জানান, ‘ওই সমঝোতা বৈঠকে আমাকে হাজির করা হয়েছিল। আমি বলেছি শুধু কয়টা টাকা দিয়েই সব শেষ। চালকের কোনো শাস্তি হবে না- এমন প্রশ্নের জবাবে উপস্থিত কেউ কোনো কথা বলেনি। এরপর আমি চলে আসি। তার ছাপ কথা আগে চালকের শাস্তি হতে হবে।’ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মনিরামপুর থানার এসআই শাহ জলিলুর রহমান বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি তার জানা নেই।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার সকালে প্রাইভেট পড়ে এক সাইকেলে চড়ে বাড়ি ফেরার পথে মণিরামপুরের বিজয়রামপুর খইতলায় হানিফ পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হয় আশিকুর রহমান ও আল-আমিন নামে মেধাবী দুই স্কুলছাত্রের। আশিকুর ও আল-আমিন দুই জনে উপজেলার ধলিগাতী হাইস্কুলের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে শ্রেণির ফার্স্ট ও সেকেন্ড বয় ছিল।