আমার এপথ যেখান থেকে শুরু..

মাহবুবুর রহমান: মাদারিপুর, একটি ছোট্ট নতুন জেলা। সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়ি ও অফিস ব্যতীত তেমন কোন ভবন তখনও গড়ে উঠেনি। কাঠের বা টিনের তৈরি একতলা বা দোতালা ঘরবাড়ি সমৃদ্ধ আড়িয়াল খাঁ নদী বেষ্টিত ছোট্ট শহর। আমি সেখান থেকে শুরু করেছিলাম আমার নতুন জীবন, আমার কর্মজীবন। সে কথা সেখানের মানুষ হয়ত ভুলে গেছে অথবা তারা এখন আর মনে করতে পারে না, কিন্তু সে সব কথা আমার অন্তর অালো করে আছে।

আমার জেলা প্রশাসক জনাব আব্দুস সাত্তার মিয়া। যে দিন তিনি এ জেলা থেকে চলে আসলেন সে দিন তিনি ২৫ কিমি. দীর্ঘ রাস্তার দু’ধারের মানুষের অশ্রুতে সিক্ত হয়েছিলেন। আমি তাঁর নিকট থেকে পেলাম মানুষকে ভালবাসার অনুপ্রেরণা।

তিনিই আমাকে বিজ্ঞ জেলা জজ বাহাদুরের নিকট ৬ মাসের আ্যটাসমেন্টে পাঠান। লক্ষ্য.. ভাল ম্যাজিস্ট্রেট তৈরি। আমি নিষ্ঠার সাথে তাঁর সাথে কাজ করেছিলাম। সাক্ষীদের জবানবন্দি লিখতে লিখতে মাঝেমধ্যে বলপয়েন্ট কলম শেষ হয়ে যেত। আর পেশকার সাহেব কলম নিয়ে দৌঁড়ে আসতেন। বিজ্ঞ কৌঁসুলিরা এ নবীনের কর্ম উপভোগ করতেন।

একদিন বিজ্ঞ জেলাজজ বাহাদুরের আদালতে একটি শিশু হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। আদালতে আলামত হিসেবে অর্ধগলিত সে শিশুর দেহ হতে উদ্ধারকৃত একটি হাফপ্যান্ট এক্সিবিট করা মাত্র আদালত কক্ষ মৃত মানুষের শরীরের গন্ধে বিষময় হয়ে উঠে। কিন্তু শিশুটির মা সে দুর্গন্ধযুক্ত কাপড়টি নাকে-মুখে চেপে ধরে তার সন্তানের শরীরের গন্ধ নেবার চেষ্টা করছিলেন এবং একসময় কেঁদে উঠে বলেন.. “এ আমার খোকার প্যান্ট, যে দিন সে হারায়ে গেলো সে দিন তার পরণে এ কাপড়টি ছিল।” এরপর এক বিষণ্নতা নেমে এলো আদালত কক্ষে। এ মানবিক দৃশ্য বিচারিক কাজে নিবেদিত হতে অনুপ্রাণিত করেছে। এছাড়া আমার বাবার পরামর্শ ছিল বড় কঠিন। সে কথাও আমি ভুলিনি।

একদিন শেষ হলো আমার প্রশিক্ষণ। বিদায়ের দিন বিজ্ঞ জেলাজজ বাহাদুর চেয়ার ছেড়ে এসে আমার মাথার ওপর হাত রেখে বলেছিলেন,” আপনি একদিন বড় ম্যাজিস্ট্রেট হবেন।” বড় বলতে কত বড় সে আমি বুঝিনি.. তবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলাম, সে কথা হয়ত মাগুরাবাসি ভুলে যাইনি।

লেখক: সাবেক জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, মাগুরা।  ফেসবুক থেকে নেওয়া।