জনগণের জন্য আমার দরজা সব সময় খোলা : মেয়র রেন্টু

যশোর পৌরসভার যাত্রা শুরু ১৯৬৪ সালে। দেড়শো বছরের পুরাতন পৌরসভার আয়তন ১৪ দশমিক ৭২ বর্গ কিলোমিটার। ৯টি ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যা ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী দুই লাখ ৮৬ হাজার ১৬৩জন। মোট ভোটার এক লাখ ৪১ হাজার ৩১০জন। এরমধ্যে পুরুষ ৫৯ হাজার ৫০৭জন ও নারী ৭১ হাজার ৮০৩জন। প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা এটি। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নৌকায় মার্কা নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন যশোর জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু। ২০১৬ সালের ৬ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

  ৭ আগস্ট  মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টুর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ রায় –

প্রশ্ন: দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপনি কতটা সফল বা ব্যর্থ ?

মেয়র: যোগাযোগ ব্যবস্থা, ড্রেনেজ, বিনোদনের ব্যবস্থা, ফুটপাথ, জলাবদ্ধতা দূর করা, সড়ক বাতি, যানজট নিরসন, স্যানিটেন ব্যবস্থা যথাযথভাবে উন্নয়ন করেছি। এর সফলতার বিচার জনগণ করবে। ব্যর্থতা বলতে জনগণ যদি সচেতন থাকতো। তাহলে উন্নয়ন কাজ শতভাগ পুর্ণাঙ্গ রুপ পেত। কারণ আমরা যে কাজগুলো করছি, জনগণ যদি সেই কাজগুলোকে ধরে রাখতো। এক কথায় সুন্দর ব্যবহার করতো, তাহলে আমাদের একই কাজ বারবার করতে হতো না। পৌরসভার মধ্যে ভারি যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করেছি। ইজিবাইককে সিস্টেমের মধ্যে এনেছি। সব কয়টি কাজেই তৃপ্তি পেয়েছি। যেমন ড্রেন করেছি। শহরে জলাবদ্ধতা নিরসন হয়েছে। অন্ধকার ছিল শহর আলোকিত করেছি। রাতেই বেলা নিঃসঙ্কোচে ঘুরে বেড়াই। দেখতে খুব ভাল লাগে। এর আগেই কেউ এমন উন্নয়ন হয়েছে কি না, সেটা জনগণই বলবে। ইতোপূর্বে যেসব কাজ হয়নি বা করেনি কেউ, সেই কাজ গত সাড়ে তিন বছরে আমরা করেছি। ব্যর্থতা, শহরে ব্যাটারিচালিত রিকসা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি নাই। এটার ক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত খুব কম লোকে বাড়িয়েছে। এই ক্ষেত্রে সিম্প্যাথি (সহানুভূতি) বেশি কাজ করে। যেমন ধরুন-যখন আক্রান্ত হচ্ছেন তখন বলছে রিকসায় সব শেষ করে দিলো। নগরে ব্যবস্থা শেষ। আবার যখন এই রিকসা চড়ে মানুষ যাচ্ছে, ধরতে গেলে চালকরা হাত পায়ে ধরছে। কান্নাকাটি করছে। তখন মানুষ তাদের পক্ষে যাচ্ছে। আমারও কিন্তু তাদের পক্ষে সিমপ্যাথি আছে। যখন দেখি মর্মান্তিক ঘটনাগুলো, তখন নিজের কাছেই খারাপ লাগে।

প্রশ্ন: নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন ?

মেয়র: যশোর পৌরসভার বয়স দেড়শো বছর পার হয়েছে। যশোরের মানুষের অনেক পাওনা আছে। যে পাওনাগুলো ইতিপূর্বে কেউ মেটাতে পারে নাই। প্রতিশ্রæতির শতভাগ কাজ করলেও অনেক পাওনা বাকী আছে। অনেক এলাকায় রাস্তা, ড্রেনের কাজ বাকী আছে। সেইগুলো করতে হবে। জনগণের জন্য আমার দরজা খোলা। সবাই অবাধে আমার কাছে আসতে পারে। দরজায় কেউ ঠেকায় না। সহজেই সাধারণ মানুষ আমার কাছে এসে আমার ভুলটাও বলতে পারে। আবার আমার ভাল কাজের কথাও বলতে পারে। আমার সম্পর্কে জনগণ কি ভাবছে, সেটা আমি জানি। আমাদের কর্মকান্ডে মানুষ খুবই খুশি। প্রতিশ্শ্রতির সব কাজ করেছি, তার তালিকা আছে।

প্রশ্ন: অনেকেই বলছেন, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচন দলীয়ভাবে না হওয়ায় ভালা- আপনার অভিমত কী ?

মেয়র: আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে একটু বলি, আমি জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। আমরা যারা সরাসরি দল করি, তাদের দলীয় প্রতীক পেলে বলবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী, না পেলেও বলবে আওয়ামী লীগের নেতা। বিষয়টি একই। কিন্তু প্রতীক দিলে আমাদের জন্য সরাসরি ভাল। জনগণ বলবে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী মনোনীত প্রার্থী। আর প্রতীক না থাকলে বলবে আওয়ামী লীগের নেতা প্রার্থী। আমরা যারা সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত তাদের জন্য প্রতীক খুব বেশি পার্থক্য থাকে না। রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকলে অন্য কথা থাকতো। সাধারণ মানুষের ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার সংস্কৃতি চালু হয়েছে অনেক আগেই। হ্যাঁ না ভোট থেকেই এই সংস্কৃতি চালু। মাঝে একটু অবস্থার উন্নতি হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী বিএনপি। একটি বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচনে কখনো আসছে, আবার কখনো আসছে না। মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়ে। কারণ জনগণ কাকে ভোট দিবে, সেটি কিন্তু নির্ধারণ করে রাখেন। যখন দেখে তার পছন্দের দল বা প্রার্থী ভোটে না আসে, তখন ওই লোকগুলোও ভোট দিতে যায় না। আগামিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সর্বস্তরের মানুষ ভোটের মাঠে যাবে বলে আশাবাদী। ভোটের চেয়ে মানুষের মূল চাহিদা হলো প্রয়োজন মেটানো। ভোট দিলো, কিন্তু প্রয়োজন মিটলো না। আবার ভোট দিলো না, কিন্তু চাহিদা মিটছে। মানুষ চাই তার ভোটাধিার প্রয়োগের মধ্যদিয়ে ভাল জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হোক। ভাল সরকার ক্ষমতায় আসুক। সেই সরকার তার চাহিদা পূরণ করুক। জনগণ চাহিদা অনুযায়ী সেই সুফল পাচ্ছে। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ অনেক উন্নয়ন হচ্ছে। মানুষ সরকারের উপর আস্থাশীল। মানুষ হরতাল, আন্দোলন পছন্দ করছে না। আগামি নির্বাচনে ভোটারদের কেন্দ্রে নিতে সব রকমের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশ্ন: অভিযোগ আছে উন্নয়ন কাজের জন্য টেবিলে টেবিলে ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ দুর্নীতি বন্ধে কী ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছেন ?

মেয়র: আমাদের পৌরসভায় দুর্নীতি নেই বললেই চলে। পৌরসভায় ব্যাংকের বুথ চালু করা হয়েছে। এখানে সব টাকার লেনদেন হচ্ছে। দুর্নীতি তো হয় অর্থ লেনদেনে। সেটি বন্ধ করার চেষ্টা করেছি। তারপরও যদি কোথাও কেউ অনিয়ম দুর্নীতি করে থাকে, তাৎক্ষনিকভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছি। দুর্নীেিত জড়িত থাকার অভিযোগে অনেককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে আমাদের এখানে কোন দুর্নীতি নেই। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ চলছে।

প্রশ্ন: জলাবদ্ধতা নিরসনে দখল হয়ে যাওয়া খাল উদ্ধার কতটা হল ? সড়ক ফুটপাত এবং খাসজমি দখলমুক্ত করার ব্যাপারে আপনি কতটা সফল। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে ?

মেয়র: জলাবদ্ধতা নিরসনে মুক্তিশ্বেরী নদীর সঙ্গে সাড়ে ৫কিলোমিটার খাল দখলমুক্ত ও খনন করা হয়েছে। এখন আর শহরে জলাবদ্ধতা নেই। শহরের পুরাতন পৌরসভা, আরএন রোডের নতুন বাজার, কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনালের দুই পাশ, বিমান অফিস মোড়, ঘোপ জেলরোডের পাশে, খালধার রোড ও নীলগঞ্জ তাঁতীপাড়া রোডের মোট সাতটি স্থাপনার দখলদার উচ্ছেদ করা হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে। কোথাও জলাবদ্ধতা নেই। জলাবদ্ধতার কোন অভিযোগ পাই না। তবে হঠাৎ করে ভারি বৃষ্টি হলে হয়তো পানি সরতে ৫/১০ মিনিট দেরি হয়।

প্রশ্ন: সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক বিক্রি, যৌন হয়রানিসহ এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এসব থেকে আপনার এলাকাকে কতটা মুক্ত করতে পেরেছেন ?

মেয়র: মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিবাজমুক্ত সুন্দর যশোর গড়তে চাই। সেই প্রত্যয়ের অংশ হিসেবে গোটা শহর সিসি ক্যামেরার আওতায় এনেছি। কোথাও কেউ অপরাধ করলে ধরা পড়বে। মাদকের ব্যাপারে আমরা সব সময় সোচ্চার। মাদক নির্মূল করতে হলে পুলিশের জোরালো ভূমিকা দরকার। মাদক নির্মূলে প্রশাসনকে সব সময় সহযোগিতা করছি।

 

প্রশ্ন: পৌরবাসী কর দিচ্ছেন। এর বিপরীতে তাদের কী ধরনের সেবা দিচ্ছেন। এতে তারা সন্তুষ্ট কি না।

মেয়র: পৌরসভার সেবায় নাগরিকরা সন্তুষ্ট। তাদের ট্যাক্সের বিনিময়ে জনগণকে পরিচ্ছন্ন শহর, সুন্দর সড়ক, সড়ক বাতি, সুপেয় পানি, আলোকিত শহর, জলাবদ্ধতামুক্ত, বিনোদনের ব্যবস্থা করেছি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছি। পৌরসভায় অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এইগুলো বাস্তবায়ন হলে যশোরবাসীর স্বপ্নপূরণ হবে। অনেক কিছু দেখতে পারবে যশোরবাসী।

প্রশ্ন: শিক্ষার মান্নোনয়নে কী ভূমিকা রাখছেন।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য কী ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছেন।

মেয়র: শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করছি। যেমন ধরুন, মিউনিসিপ্যাল প্রিপারেটির স্কুলে আগে পাশের হার ছিল খুবই কম। সাড়ে তিন বছরে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এখন পাসের হার শতভাগ। এছাড়াও সরকারি এমএম কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজের উন্নয়নে আমরা এগিয়ে আসছি। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আমার যোগাযোগ আছে। তাদের সমস্যাগুলো দেখছি। মহিলা কলেজের ভিতরে ফুটপাত করে দিয়েছি।

প্রশ্ন : স্থানীয় হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসাসেবার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কী ভূমিকা পালন করছেন? 

মেয়র: যশোর জেনারেল হাসপাতালের উন্নয়নে আমরা কাজ করছি। চারমাস ধরে সেখানে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নিয়েছি। তাদের জনবল সংকট আছে। পৌরসভা থেকে আমরা লোক দিয়েছি। হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা, এসি, কেন্দ্রীয় ক্যাশ কাউন্টার, ফ্যান, সরকারি ওষুধ মান সম্মত কিনা সেটি বুঝে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ভাল চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে সহযোগিতা করছি।

প্রশ্ন : পৌরসভার মান উন্নয়নে কি করছেন ?

মেয়র: পৌরসভার মান উন্নয়নে কাজ করছি। মানসিকভাবে শক্তিশালী করেছি। তারা যার যার যোগ্যতাই কাজ করলে মূল্যায়ন হবে। কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। পৌরসভার কর্মীদের কারো ক্ষোভ নেই। তবে কর্মীদের অবসরকালীন আনুতোষিক নিয়ে কষ্ট থাকতে পারে। আমরা সেটি ৫০ শতাংশ দিচ্ছি। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি রেখেই আমরা কাজ করছি।

প্রতিবেদক: সাক্ষাৎকার দেওয়ার আপনাকে ধন্যবাদ।

মেয়র: আপনাকেও ধন্যবাদ।