মূল্যবান বন্যপ্রাণি তক্ষক : যশোরে চার পাচারকারী আটক

ব্যুরো রিপোর্ট: প্রাণিটির নাম ‘তক্ষক’। দেখতে গুই সাপের বাচ্চার মতো। গায়ে লাল সিঁদুরের ও সাদা ফোঁটার মতো রয়েছে। আকারে ছোট। তবে ছোট হলেও অনেক বয়সী। পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে এই প্রাণি চড়ামূল্যে বিক্রি হয়। কারণ তক্ষকের ওষুধি গুণ রয়েছে বলে শোনা যায়। এই প্রাণির দুই ধরনের পা রয়েছে। কোনটার ‘মুরগী পা’ আর কোনটার ‘হাঁস পা’। ‘হাঁস পা’গুলোর দাম খুব বেশি। সর্বনিন্ম সাড়ে ৯ ইঞ্চি লম্বা ও ৫২ গ্রাম ওজনের ‘হাস পা’ চলে। এর কম ওজন বা লম্বায় সাড়ে ৯ ইঞ্চির ছোট হলে চলবে না। ইঞ্চির মাপ ধরা হয় চোখ থেকে লেজের শেষ পর্যন্ত। ‘মুরগি পা’গুলো ২৫৫ গ্রাম ওজন ও সাড়ে ১৫ ইঞ্চি লম্বা হতে হবে। এ ছাড়া একটা আছে ‘বার্মিজ’। ‘বার্মিজটা’ ওজন সাড়ে তিনশ গ্রামের নিচে হলে বিক্রির অনুপযুক্ত। 

তক্ষক পাচারকারী সন্দেহে যশোরে চারজন আটক:
যশোর সদর উপজেলার আবাদ কচুয়া গ্রাম থেকে চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে একটি তক্ষক উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। আটককৃতরা হলন, সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা উপজেলার কুমিরা নওয়াকাঠি গ্রামের এরশাদ আলী সরদারের ছেলে আলমগীর হোসেন সরদার (৩০), যশোরের কেশবপুর উপজেলার মঙ্গলকোট গ্রামের শওকত আলী মোড়লের ছেলে রফিকুল ইসলাম (২৮), একই উপজেলার বুড়োলিয়া গ্রামের আব্দুল মজিদ সরদারের ছেলে ইউনুচ আলী সরদার (৪৮) এবং যশোর শহরতলীর মুড়লী ইমামবাড়ার পেছনের শ্বশুর মৃত এরশাদ মিয়ার জামাই মোস্তাক বিল্লাহ (৩৮)।জানতে পেরে সদর উপজেলার আবাদ কচুয়া গ্রামের মধ্যপাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে অভিযান চালানো হয়। ওই গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের পিছন থেকে চারজনকে ধাওয়া করে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে তক্ষক জব্দ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি বণ্য প্রাণী সংক্ষণ কর্মকর্তাদের কাছে তক্ষক সাপটি হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে।
বণ্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণের খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তারা বলেন, তক্ষকের বিষয়টি আমরা এখনো পরিষ্কার হতে পারিনি। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে জানা গেছে, পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে এই প্রাণি চড়ামূল্যে বিক্রি হয়। তক্ষকের ওষুধি গুণ রয়েছে বলে শোনা যায়। কোনো কোনো দেশে এ দিয়ে ওষুধ তৈরি করে থাকতে পারে। এই প্রাণি বিক্রির ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দর-দাম হয় দুইভাবে। একটা থোক। আরেকটা স্ক্যান করে প্রাণির শরীরে থাকা ‘দানা’ হিসেব করে। তবে বেশির ভাগ বিক্রেতা স্ক্যানের বিপক্ষে। তারা থোক দরদাম করেন।

তক্ষক দিয়ে কী করা হয়- জানতে চাইলে কেউ কেউ বলেন, প্রাণিটা পুরো গলিয়ে ক্যান্সারসহ দূরারোগ্য ব্যাধির ওষুধ তৈরি করা হয়। এই প্রাণি কাউকে কামড় দেওয়ার পর তার ঘাঁ শুকিয়ে গেলে ওই ব্যক্তির শরীরে কোনো ধরনের রোগ-জীবাণু থাকবে না। আবার কেউ কেউ বলেন, এটার শরীরে থাকা দানা এক করে ড্রোন তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কেউ নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। এই প্রাণির সন্ধানে ঘোরা মানুষদের সঙ্গে আরেক শ্রেণির মানুষ প্রতারণা করছেন। ঢাকা থেকে গিয়ে প্রতারণার শিকারও হন তারা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, এটি সরিসৃপ জাতীয় প্রাণি। এরা নিশাচর। গাছের গর্তে বাস করে। বিভিন্ন পোকামাকড়, পাখির ডিম খেয়ে এরা বেঁচে থাকে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, ‘সাউথ ইস্ট এশিয়ায় অনেকেই পোষা প্রাণির মতো তক্ষক লালন করে বলে শোনা যায়। তারা মনে করেন, এই প্রাণি বাড়িতে থাকলে তাদের সৌভাগ্য বয়ে আনে। নিঃসন্তানদের সন্তানাদি হয়।’ তিনি আরো জানান, এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘Gekko gecko’। ইংরেজিতে একে ‘Tokay gecko’ বলা হয়। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত কিছু কিছু দ্বীপাঞ্চলে এই প্রাণি রয়েছে।
উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, ভারত ও বাংলাদেশসহ মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কাম্পুচিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় ৬০০ প্রজাতির তক্ষকের বাস।