সিসি সাংবাদিকতা

শাহাদত হোসেন কাবিল: সিসি সাংবাদিকতা সংবাদ কর্মীদের প্রতিভা বিকাশের অন্তরায়। লক্ষ্য করা গেছে সাংবাদিকতায় সিসি পথ অবলম্বন করায় আর কোনো ভালো সাংবাদিক সৃষ্টি হচ্ছে না। শিরোনাম পড়ে পাঠকদের অনেকেই হোঁচট খেতে পারেন সে আবার কোন ধরণের সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা অঙ্গনে এটি এখন একটি বহুল পরিচিত ও প্রচলিত বিষয়।
সিসি হলো কার্বন কপির সংক্ষিপ্ত রূপ। প্রযুক্তির বিকাশের কল্যাণে এখন সাংবাদিকতা অঙ্গনে কাগজ-কলমের ব্যবহার নেই। হাতের লেখা কোনো বিষয়ের অতিরিক্ত কপির জন্য আগেকার দিনে কার্বন পেপার ব্যবহার করা হতো। এই নিয়ম এখন কমে গেলেও একেবারে উঠে যায়নি। এই পেপারের এক পিঠে এক ধরণের কালির আবরণ থাকতো। মূল কপির নিচে ওই কার্বন পেপার রেখে মূল কপিতে লিখলে একই সাথে একাধিক কপি লেখা হয়ে যেত। মূল কপির অতিরিক্ত কপিকে কার্বন কপি বলা হয়। ফটোস্ট্যাট আসার পর এই কার্বন কপির ব্যবহার অনেকটা কমে যায়। কম্পিউটারে কম্পোজ করে এক সাথে একাধিক জায়গায় পাঠানোর ক্ষেত্রে কোথাও ই-মেইল করার পর কম্পোজকৃত কপি কিন্তু থেকে যায়। এই কপি যখন একাধিক কাউকে দেয়া হয় তখন তাকে সিসি এবং বিসিসি (ব্লাইন্ড কার্বন কপি) বলা হয়।
সাংবাদিকরা আজকের দিনে সিসির প্রতি ঝুঁকেছেন বেশি। কেউ কোনো রিপোর্ট লিখলে অন্যরা তার কাছ থেকে সিসি নিয়ে নিজের পত্রিকা বা মিডিয়ায় পাঠাচ্ছেন। একজন সাংবাদিক অন্য আর একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে তথ্য উপাত্য নেবেন এতে দোষের কিছু নেই। তথ্যের বিনিময় না হলে একটি ঘটনার বহুল প্রচারের সুযোগ সৃষ্টি হয় না। তথ্য বিনিময়ের পর সাংবাদিকরা যে যার মতো করে রিপোর্ট তৈরি করবেন এটাই নিয়ম। কিন্তু হালে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যিনি সিসি নিচ্ছেন তিনি ওই কপিতে তার হাতের ছোঁয়া না লাগিয়েই হুবহু তার পত্রিকায় বা মিডিয়ায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এতে পরের দিন একই ভাব- ভাষায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেই রিপোর্টটি দেখা যাচ্ছে। মৌলিক রিপোর্টের ক্ষেত্রেও ঘটছে একই ঘটনা।
আগেকার দিনে কিন্তু কার্বন কপি নিয়ে তা তার পত্রিকায় বা মিডিয়ায় পাঠানোর সুযোগ ছিল না। কারণ গণমাধ্যমে পাঠাতে হতো হাতের লেখা কপি। কার্বন কপি গৃহীত হতো না। এই সিসি মার্কা সাংবাদিকতায় সাংবাদিক না হয়েও এলাকায় একজন বড় সাংবাদিক হয়ে যাচ্ছে। যেমন একজন ভালো সাংবাদিকের কাছ থেকে সিসি নিয়ে তার মিডিয়ায় পাঠানো পর যখন সেটা প্রকাশ হচ্ছে তখন পাঠক তো দেখছেন ভালো রিপোর্ট করেছে। কিন্তু বিষয়টা বাইরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাটের মতো।
আগেই বলেছি কারো কাছ থেকে তথ্য নেয়া দোষের নয়। আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতা পাঠকের সাথে শেয়ার করলে বোঝা সহজ হবে। একবার সন্তানতুল্য সাংবাদিক আবদুল কাদের দৈনিক স্পন্দনে চাঁচড়ার রেণুপোনা নিয়ে একটি অত্যন্ত সুন্দর রিপোর্ট করেছিল। রিপোর্টটি দেখে সাংবাদিক হিসেবে ওই ভালো রিপোর্ট করার লোভ আমি কোনো রকমেই সামলাতে পারছিলাম না। আর এ কারণে রিপোর্টটি বার বার পড়ছিলাম। এক পর্যায়ে পথ পেয়ে গেলাম। আবদুল কাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছিল চাঁচড়ায় উৎপাদিত রেণুপোনায় দেশের ৭০ ভাগ চাহিদা পূরণ হয়। আমি সংবাদটি চুরি করলাম। সে চুরি কেমন বলি। আবদুল কাদেরের ওই রিপোর্ট থেকে ‘চাঁচড়ায় উৎপাদিত রেণুপোনায় দেশের ৭০ ভাগ চাহিদা পূরণ হয়’ এই কথাটুকু রিপোর্টের সূত্র হিসেবে নিলাম। পরে মৎস্য ঢাকায় অধিদফতরের সাথে যোগাযোগ করে মাছের ওপর একটি ন্যাশনাল স্টোরি করলাম। সেটি লিড নিউজ হিসেবে ছাপা হলো আমার কর্মস্থল একটি জাতীয় দৈনিকে।
এর কিছুদিন পর ‘রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আয়োজিত চৌগাছায় সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কোর্সে আমাকে রিসোর্স পারসন হিসেবে মনোনীত করা হলো। আমি স্থির করলাম ওই কোর্সে আমি সিসি সাংবাদিকতা সম্পর্কে আলোচনা করবো। ওই কোর্সে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে সিসি সাংবাদিকতার বিষয়ে আলোচনা তুলে বললাম তথ্য শেয়ার করা অপরাধ নয়, তবে রিপোর্টটা তৈরি করতে হবে নিজের মতো করে। এরপর বললাম আমার একটি চুরি করা রিপোর্ট আছে। এই বলে আবদুল কাদেরের লেখা দৈনিক স্পন্দনের সেই রিপোর্টটি পড়লাম। তারপর বললাম এই রিপোর্টটি চুরি করে আমি কি লিখেছি শুনুন। পরে পড়লাম আমার সেই রিপোর্টটি। এরপর কয়েকজন সাংবাদিক দাঁড়িয়ে গেলেন। তারা বললেন, আপনি সঠিক বলছেন না। আপনি তো সম্পূর্ণ ভিন্ন রিপোর্ট লিখেছেন।
আমি তাদের কথার উত্তরে বলেছিলাম আমি ভিন্ন রিপোর্ট লিখেছি এতে কি সবাই কি একমত?
তারা সবাই বলেছিলেন, দুটি রিপোর্ট পড়ে তো তাই মনে হলো।
আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলাম যদি তাই হয় তাহলে আপনারা সিসি সাংবাদিকতা না করে এ ধরণের চুরি করবেন। এতে দোষ নেই।

 লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, যশোর। লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া লেখাটি।