কোভিড-১৯, গুজব এবং আমরা

অধ্যাপক আবদুল হাই : করোনা যদি একটি আতঙ্ক হয় , তবে গুজব একটি বিভীষিকা । করোনা যেমন পরজীবী, তেমনি গুজবও পরজীবী । করোনার বৃদ্ধি ক্ষেত্র হচ্ছে জীবিত কোষ। আর এই জীবিত কোষ অর্থাৎ মানুষের মনোভূমি হচ্ছে গুজবের উর্বর ক্ষেত্র। সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়া থেকে ইউরোপ , ইউরোপ থেকে আমেরিকা তথা সারা বিশ্বে যেমন করোনার আতঙ্ক ছড়িয়েছে , তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়বাড়ন্ত হয়েছে গুজবের। চীন থেকে কোরিয়া হয়ে ইরান, ইতালি ,স্পেন, ফ্রান্স , আমেরিকায় মৃত্যুর মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে গুজবের শাখা-প্রশাখা ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে । সূত্র ও লিংক বিহীন বিভ্রান্তিকর ও ভয় জাগানিয়া শত শত অডিও ও ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে । মানুষ এসব বিশ্বাস করছে । এর পেছনে সর্বশক্তি নিয়োগ করছে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্ব এরকম ভাইরাসের সংক্রমণ যেমন প্রত্যক্ষ করেনি , তেমনি এর আগে বিশ্ববাসীকে এরকম গুজবের মোকাবেলা ও করতে হয়নি।

গুজব কে ছড়িয়ে দেয় ,কেন ছড়ায় ,কিভাবে ছড়িয়ে পড়ে , মানুষ কেন বিশ্বাস করে , কারা এর উপকারভোগী , আর গুজবের মনস্তত্ত্বই বা কি ? এসব গবেষণায় না গিয়েও বলা যায়, যুদ্ধকালীন সময়ে প্রাকৃতিক অথবা মনুষ্যসৃষ্ট কোন দুর্যোগে, রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে ,মহামারীতে অথবা অবরুদ্ধ সমাজে গুজব বেশি বেশি ছড়ায় এবং দ্রুত ছড়ায়। কারণ এরকম সময়ে মানুষ মানসিকভাবে দুর্বল থাকে এবং তথ্যের প্রবাহ কম থাকে। বিধায় যেকোনো তথ্য কে আঁকড়ে ধরে মানুষ বাঁচতে চায়। তবে শান্তিকালীন সময়ে অপেক্ষাকৃত মুক্ত সমাজেও প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার কে কাজে লাগিয়ে গুজব ছড়ানো হতে পারে। উদ্দেশ্য হতে পারে আদর্শিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা লোটা। বিরোধী মতামতকে দুর্বল করে দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করা।

ইতিহাসে এরকম গুজবের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। উহুদের যুদ্ধে হযরত মুহাম্মদ সাঃ শাহাদত বরণ করেছেন বলে গুজব ছড়িয়ে বিধর্মীরা মুসলিমদের মনোবল গুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল । ক্রুশবিদ্ধ করার আগে যিশুখ্রিস্টের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো হয়েছিল। সক্রেটিসকে হেমলক পান করানোর পূর্বে তাঁর সম্পর্কে সমাজে গুজব ছড়ানো হয়েছিল । ফরাসি স্বাধীনতা সংগ্রামী যোয়ান অফ আর্ক ‘কে পুড়িয়ে হত্যার আগে ডাইনি বলে গুজব ছড়ানো হয়েছিল । আর আমাদের বঙ্গভূমি তো গুজবের উর্বর ক্ষেত্র। নিকট অতীতে এখানে চাঁদে সুফি সাধকদের ছবি দেখতে পাওয়ার গুজব জনপ্রিয়তা পেয়েছে ! সেতু নির্মাণে মাথা বিসর্জনের ডালপালা মেলেছে । আর ছেলেধরা সন্দেহে অসংখ্য ‘রেনু ‘ কে গুজবের বলি হতে হয়েছে।

জি আই জে এন এর একটি প্রতিবেদনে গুজব ছড়ানোর ছয়টি কৌশলের উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো : ছবিতে কারসাজি, বানোয়াট ভিডিও, সত্যের বিকৃত উপস্থাপন , নকল ও কাল্পনিক বিশেষজ্ঞ তথা ভুয়া বক্তব্য, গণমাধ্যমের অপব্যবহার ও তথ্য বিকৃতি। সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতিতে গুজব ছড়ানোর জন্য এই সবগুলো কৌশলের সার্থক ব্যবহার করা হয়েছে।সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব গুলো লক্ষ্য করলে এইসব প্রবণতা আমাদের সামনে পরিষ্কার হবে।

করোনা প্রতিরোধে ঘরোয়া করণীয় সম্পর্কিত প্রতিকারমূলক গুজব:

মধ্য মার্চের দিকে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে হুলুস্থুল পড়ে যায় থানকুনি পাতার খোঁজে। বলা হয় থানকুনি পাতা খেলে করোনা প্রতিরোধ সম্ভব । একইভাবে কালোজিরা নিয়েও গুজব ছড়িয়ে পড়ে । আবহমানকাল থেকে থানকুনি পাতা এবং কালোজিরার ঔষধি গুনাগুন সর্বজনস্বীকৃত। এদু’টি ভেষজের অ্যান্টি মাইক্রোরিয়াল এজেন্ট রোগ জীবাণু ধ্বংসে সাহায্য করে। কিন্তু করোনা প্রতিরোধ করে এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই । অথচ আমরা তা বিশ্বাস করেছি।

একটি ভিডিওতে দেখা যায় সিলেটের কোন একটি গ্রামে জন্ম নেয়া একটি সদ্যোজাত শিশুর ছবি। যে কিনা মৃত্যুর আগে মাত্র একটি শব্দ উচ্চারণ করেছে “চা”। কেউ কেউ আবার শিশুটির একটি কল্পিত কিম্ভুতকিমাকার মাথার ছবি প্রদর্শন করেছে। কেউ আবার চীনের ডাক্তারদের বরাত দিয়ে বলছে ; ওখানে করোনা প্রতিরোধে ডাক্তারদের প্রধান ওষুধ ছিল চা পান করানো। শুরু হয়ে যায় বাজারে , শপিং মলে গ্রিন টি এর অনুসন্ধান এবং ঘরে ঘরে লেবু সহযোগে লাল চা পানের প্রতিযোগিতা । গ্রিন টি এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং লেবু চা সর্দি কাশির উপশম করে। কিন্তু করোনা প্রতিরোধ করে এর কোনো প্রমাণ নেই । এসব নিছকই গুজব।

একই ধরনের গুজব ছড়িয়েছে রসুন এবং তিলের তেল নিয়ে। বলা হয়েছে গায়ে তিলের তেল মাখুন । করোনা হবে না । তিলের তেল করোণা আটকাতে পারেনা । ৭৫ পার্সেন্ট ইথানল , পেরাসেটিক অ্যাসিড , ক্লোরোফরম জাতীয় কিছু রাসায়নিক করোনা ভাইরাস মারতে পারে। তবে এসব গায়ে মাখলে আপনাকে কসমেটিক সার্জারি করতে হতে পারে।

করোনা প্রতিরোধে ওষুধের ব্যবহারজনিত গুজব:

করোনার প্রতিষেধক হিসেবে নাপা , সিভিট, ওরস্যালাইন থেকে নিউমোনিয়ায় ব্যবহৃত ওষুধ, এমনকি এন্টিবায়োটিক কেনার ধুম পড়ে যায়। আর এ সবই সম্ভব হয়েছে গুজবের সফল প্রসারের কারণে। নিউমোনিয়া ভ্যাকসিন নিউমোনিয়া প্রতিরোধের জন্য। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধের ক্ষেত্রে । এসব যদি করোনার প্রতিষেধক হতো তাহলে বিশ্বব্যাপী করোনা সর্বগ্রাসী রূপ নিতে পারতো না । কোন কোন বিশেষজ্ঞকে বলতে শোনা যায় , “লবণ পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করুন”। এটি একটি নিছক গুজব। এতে সর্দি-কাশির উপকার হতে পারে , করোনার নয়।

ফলমূল ভক্ষণ জনিত প্রচারণা:

ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলমূল বাজার থেকে দ্রুত উধাও হতে থাকে। ভিটামিন সি শরীরের ইমিউনিটি কে বাড়িয়ে তোলে, যা যেকোনো রোগ তথা করোনা প্রতিরোধে সহায়ক । কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে দু-একদিন ভক্ষণেই কি ইমিউনিটি বৃদ্ধি পায় ? নাকি এটি সার্বিক জীবনাচরণ তথা দৈনন্দিন খাদ্য তালিকার একটি বিষয় !

ধর্মের সংশ্লেষ যুক্ত গুজব:

ভুল উদ্ধৃতি বা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির অসংখ্য নজির ইতিহাসে রয়েছে। করোনার প্রাণঘাতী বিস্তারের মধ্যেই প্রতিবেশী দেশ ভারতে গঙ্গা জল পান ও গোমূত্র পানজনিত দুটি গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আশার কথা গুজব দু’টির অসারতা দ্রুতই প্রমাণিত হয়, জনৈক ধর্মগুরুর অসুস্থতার মধ্য দিয়ে । পক্ষান্তরে বাংলাদেশের মসজিদ গুলোতে একসঙ্গে নামাজ পড়ার বিষয়টি নিরুৎসাহিত করলে সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। একদল ছড়িয়ে দেন, মরতে হলে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েই মরবো । তবুও মসজিদ বন্ধ হতে দিব না । বাস্তবে বাংলাদেশে মসজিদ বন্ধের কোনো ঘোষণা আসেনি। মূলত সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতেই মসজিদে একসঙ্গে নামাজ কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে দুই ভাবে করোনা ছড়ায়। প্রথমত আক্রান্ত রোগীর হাচি-কাশি থেকে নিঃসৃত ড্রপলেট বাতাসে ছড়ায় । এই বাতাসের সংস্পর্শে কেউ আসলে তার মধ্যে এটি সংক্রমিত হতে পারে । আর এ কারণেই সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হয় । যেটি মসজিদে নিশ্চিত করা সম্ভব নয় । এতে ধর্মের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই । বরং উল্টো প্রশ্ন করা যায়, ভাইরাসজনিত অন্যান্য রোগ যেমন বসন্ত, সার্স জাতীয় রোগের ক্ষেত্রেও রোগীর সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে আইসোলেশন করা হয়। ধর্মের প্রসঙ্গ তোলা হয় না। তাহলে করোনায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকল্পে সরকারের এই ঘোষণা নিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি কেন?

সংক্রমণের প্রথমদিকে চীন ও অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনা কে আল্লাহর গজব বলা হয়েছে। পরবর্তীতে মুসলিম দেশগুলোতে সংক্রমনের ফলে বাজার থেকে এই গুজব নিখোঁজ হয়েছে । এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশের (কুয়েত ) রাতের আকাশে অদ্ভুত আলো দেখা , মধ্যরাতে সবাই মিলে একসঙ্গে আজান দিয়ে করোনা প্রতিরোধ জাতীয় নানান ধরনের কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে । যেগুলো এই প্রতিকূল পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলছে।

ব্যবসায়িক ফায়দা সম্পর্কিত গুজব:

দেশে খাদ্যের কল্পিত মজুদ কম দেখিয়ে চাল ডাল পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যের যেমন মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে , তেমনি গৃহে গৃহে ফ্রিজে সংরক্ষিত খাবার জব্দ করা হবে ,এ সম্পর্কিত অদ্ভুত গুজবও ছড়িয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য যে এই গুজব নিরসনে দক্ষিণের কোন কোন জেলায় প্রশাসনকে বিবৃতি পর্যন্ত দিতে হয়েছে । আবার লকডাউন সম্পর্কিত মিথ্যা সংবাদের প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে হয়েছে যশোরের জেলা প্রশাসনকে।

এগুলো ছাড়াও শুধু বয়স্কদের মধ্যে করোনা ছড়ায়, শিশুরা রক্ষা পায়। নারীদের মধ্যে সংক্রমণ হয় না। শীতল আবহাওয়ায় করোনা ছড়ায় , উষ্ণতায় নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় । ধূমপায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় , অধূমপায়ীরা রেহাই পায় এসব প্রচারণা প্রমাণিত নয় । সম্ভাবনা মাত্র। অথচ এইগুলো সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়াচ্ছে। মৃত্যু ও সংক্রমণের সংখ্যা নিয়েও গুজবের ডালপালা বিস্তৃত হচ্ছে । একটি ভিডিওতে চট্টগ্রামের একজন ডাক্তার তার কল্পিত প্রিয়জন “রোহান ” কে সংক্রমণের আবেগঘন বর্ণনা দিচ্ছেন । আরেকটি ভিডিওতে সংক্রমিত একজন নারীকে হাপুস নয়নে কাঁদতে দেখা যাচ্ছে । যেগুলো রীতিমতো ভীতিকর। আবার মৃত ব্যক্তির সৎকার নিয়েও গুজব রটেছে। সৎকার করতে গিয়ে প্রশাসনকে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এ কারণে বগুড়ার সহকারি পুলিশ সুপার কুদরত ই খুদা কে আক্ষেপ করে স্ট্যাটাস পর্যন্ত দিতে দেখা গেছে । বস্তুতপক্ষে পুরো দেশটা যেন গুজবের কারখানা হয়ে উঠেছে । এসব করতে গিয়ে ছেলে-বুড়ো শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবাই যেন এক একজন সংবাদকর্মী এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে । গুজবের এই বাড়বাড়ন্ত সরকারের প্রতিরোধ কর্মসূচি কে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করছে তেমনি জনসাধারণের মনোবলকে ও ভঙ্গুর করছে।

গুজব জনিত এই বাস্তবতা কবির লেখনীতেও চমৎকারভাবে ধরা পড়েছে-

গুজব যখন মাত্রা ছাড়ায়
মাতালরা হয় দামি,
কাজ নেই তাই অকাজ বিকোয়,
হাত গোটানো মাস্তানি।
গুজব
( মন্টু হালদার)

গুজবের সর্বগ্রাসী এই মাস্তানিকে রুখতে সরকারের সঠিক প্রচারণা যেমন জরুরী , তেমনি জনসাধারণের সহযোগিতা ও প্রয়োজন । সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জনসাধারণের শিক্ষা ও সচেতনতার যেমন প্রয়োজন, তেমনি উক্ত মাধ্যমগুলোর উপর সরকারি নজরদারি ও গুরুত্বপূর্ণ। আবার ক্ষেত্রবিশেষে আইনের সংশোধন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ এই অবস্থা উত্তরণে সহায়ক হতে পারে।