একজন পূর্ণদাস বাউল

সে প্রায় অনেক বছর আগের কথা। তেতাল্লিশের মন্বন্তর ছেয়ে ফেলেছে গোটা বাংলাকে। চারদিক শুকিয়ে কাঠ। মন্দা। বাড়িতে বাড়িতে ভাত নেই। দিশেহারা পরিস্থিতি। একটি ছেলে অভাবের তাড়নায় নেমে পড়ল রাস্তায়। তারপর স্টেশন প্ল্যাটফর্ম। বীরভূমের স্টেশনগুলোয় ঘুরতে ঘুরতে সেই ছেলেটা উপলব্ধি করেছিল বাঁচার যাত্রাপথ। এই যাত্রাপথের সঙ্গী সে একা নয়, পাশে নিশ্চয় থাকবে ‘সোনার গৌর’। ছোটোবেলায় ভয়াবহ দারিদ্র্য পার করে আসা সেই ছেলে আজকের বাউল-সম্রাট। আজকের পূর্ণদাস বাউল।
বাড়িতে গানের পরিবেশ ছিল প্রথম থেকেই। একটু একটু বাবার কাছে শিখে নেওয়া বাউল-তত্ত্ব আর ভাবরস। এই ভাবরসের নদীতে ডুব দিয়েই একদিন পূর্ণদাস গেয়ে উঠলেন ‘গোলেমালে গোলেমালে পিরিত কোরো না’। বাবা নবনীদাস বাউল সান্নিধ্য পেয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের। এমনকি প্রখ্যাত কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গেও পরিচয় ছিল তাঁর। পূর্ণদাসের বয়স তখন মাত্র নয় বছর। সেই প্রথম বাংলার বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন নিজের গান। বাউল গান। বাংলার গান। জয়পুরে সেই অনুষ্ঠান শেষে পান স্বর্ণপদক। শিল্পের প্রতি এই খিদেই তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল রাশিয়া। মুখোমুখি হচ্ছেন অ্যালেন গ্রসম্যানের। তারপর আমেরিকার বিখ্যাত মিউজিক্যাল প্ল্যাটফর্ম উডস্টক। দেখা দিয়েছেন সোনার গৌর। দেখা দিয়েছেন বব ডিলান, যে বন্ধুত্বের কথা মনে রাখবে আপামর সংগীতপ্রেমী।
‘হোয়েন দ্য নাইট কাম্স ফলিং ফ্রম দ্য স্কাই’ গানে বব ডিলান যা লিখেছেন, তার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, দেখেছি হাজার অন্ধকার জয়ী মানুষ, সামান্য অর্থের মোহে কালোয় ডুবে যায়; কাছে কাছে থাকো এই ক্রান্তিলগ্নে, আমার জন্য ভেবো না। আমি ঠিক থাকব তখন, যখন আকাশ থেকে রাত্রি নেমে আসবে, নিভৃতে। এই গান আসলে বন্ধুত্বের, ভালোবাসার, উদযাপনের।
পূর্ণদাস হলেন প্রথম বাউল, যিনি বাংলার বাউল গানকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বের মঞ্চে। বিদেশ তাঁর হাত ধরেই চিনতে শুরু করছে বাউল-তত্ত্ব আর ভাবরস। তাঁকে শ্রদ্ধা…..

।। সূত্র: সাংবাদিক সাজেদ রহমানের ফেসবুক ওয়াল থেকে ।।