রসগোল্লার আবিষ্কার

রসগোল্লার আবিষ্কারক কে, কখন ও কোথায় এর আবিষ্কার- এসব নিয়ে প্রচলিত আছে ভিন্ন মত। সবচেয়ে প্রচলিত মত হলো- কলকাতার সাবেক চিনি ব্যবসায়ী নবীন চন্দ্র দাস রসগোল্লার আবিষ্কারক। তার পঞ্চম প্রজন্মের উত্তরসূরি ধীমান দাসের মতে, রসগোল্লার আবিষ্কার নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু এই রসগোল্লা প্রথম কোথায় তৈরি হয়- এ নিয়ে দু’ভাগ হয়ে গিয়েছিল ভারতের দুই রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িশ্যা। এভাবে স্বত্ব নিয়ে লড়াইয়ের আড়াই বছর পর ২০১৭ সালে রসগোল্লার জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তথ্যসূত্র: সমকাল, বিবিসি, আনন্দবাজার, আজকাল ও উইকিপিডিয়া।

ধীমান দাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নবীন চন্দ্র দাস ছিলেন চিনি ব্যবসায়ী। ১৮৬৪ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে একটি মিষ্টির দোকান দেন তিনি। দোকানটি বেশিদিন না চলায় ১৮৬৬ সালে কলকাতার বাগবাজারে আরেকটি মিষ্টির দোকান দেন নবীন। এই দোকানটির প্রধান মিষ্টি ছিল সন্দেশ। এক পর্যায়ে কলকাতার খানদানি বণিকদের জন্য নতুন মিষ্টি তৈরির কথা ভাবতে থাকেন নবীন এবং দুই বছরের চেষ্টায় রসগোল্লা তৈরি করেন।

ধীমান দাসের মতে, কলকাতার তৎকালীন ধনাঢ্য ব্যক্তি ভগবান দাস বাগলার একদিন বাগবাজার দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় ঘোড়ায় টানা জুড়ি গাড়িতে ছিল তার ছেলে। ছেলে জল পান করতে চাইলে নবীনের মিষ্টির দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করান ভগবান। তখন ছেলেকে এক গ্লাস জল ও একটি রসগোল্লা খেতে দিলে সে খুবই মজা করে খায়। এরপর বাপ-বেটা এক হাঁড়ি রসগোল্লা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এ গল্প কলকাতার ছড়িয়ে পড়ে আর রসগোল্লাও বিখ্যাত হয়ে যায়।

তবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ব্যবসায়ী ও রসগোল্লা ভক্তের অনেকে বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের কারিগরদের হাতেই রসগোল্লার জন্ম। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে ও অতিথি আপ্যায়ণে মিষ্টি পরিবেশনের বিষয়টি বহুকাল ধরেই বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর নানা প্রকারের মিষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হলো রসগোল্লা।

খাদ্য বিষয়ক লেখক ও গবেষক শওকত ওসমান বিবিসিকে বলেছেন, লিখিত কোনো প্রমাণ না থাকলেও, তাদের ধারণা, ষষ্ঠ শতকে দক্ষিণাঞ্চলীয় পটুয়াখালীতে পর্তুগিজরা দুধ থেকে পনির ও সন্দেশ তৈরি করতো। সেগুলো দিয়েই বাঙালি স্ত্রীরা রসগোল্লা বা এ ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি করেন।

তিনি আরও বলেন, রসগোল্লা আবিষ্কারক হিসেবে কলকাতায় যে নবীন চন্দ্রের কথা বলা হয়, তিনি বরিশাল অঞ্চলের লোক। এক সময় তিনি পটুয়াখালীর কাছেই থাকতেন। তার হাত ধরে শিল্পটি সেখানে (কলকাতায়) যেতে পারে।

১৪৫ বছর ধরে মিষ্টি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মরণ চাঁদ গ্র্যান্ড সন্স। প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে ঢাকায়। ফার্মগেট শাখার ব্যবস্থাপক রবীন্দ্রনাথ রায়ও বিবিসিকে বলেন, রসগোল্লা বাংলাদেশের কারিগরদেরই উদ্ভাবন।

আর উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে, রসগোল্লার আদি উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চল। বিশেষ করে, পর্তুগিজদের সময় পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার ময়রারা ছানা, চিনি, দুধ ও সুজি দিয়ে গোলাকার এক ধরণের মিষ্টান্ন তৈরি করেছিলেন। সেটাই ক্ষীরমোহন বা রসগোল্লা নামে পরিচিত।

পরে বরিশাল এলাকার হিন্দু ময়রাদের বংশধর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতা কিংবা উড়িশ্যায় বিস্তার লাভ করে। কলকাতার আজকাল পত্রিকাও রসগোল্লার আবিষ্কার বিষয়ে একই তথ্য দেয়।

তবে আজকাল রসগোল্লা আবিষ্কারের বিষয়ে আরেকটি মত উল্লেখ করেছে। পত্রিকাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কেউ কেউ মনে করেন, রানাঘাটের হারাধন ময়রা প্রথম রসগোল্লা বানান। তার দোকানে একবার চিনির রসে দুর্ঘটনাক্রমে কিছু ছানার গোল্লা পড়ে যায়। আর সেটাই হয়ে যায় রসগোল্লা।

তবে রসগোল্লাকে তাদের ৮০০ বছরের পুরনো নিজস্ব আবিষ্কার বলে দাবি করে উড়িশ্যা। তাদের প্রচলিত মত, রথযাত্রা শেষে সাত দিন খালার বাড়ি কাটিয়ে মন্দিরে ফেরার সময় রসগোল্লা ছিলো জগন্নাথ দেবের ‘পাসওয়ার্ড’। স্ত্রী লক্ষ্মীর মান ভাঙিয়ে মন্দিরে ঢুকতে হয় তাকে। হাঁড়িভরা রসগোল্লা দিয়ে বৌয়ের মন গলান তিনি।

সেই রীতি মেনে এখনও মন্দিরের সেবায়েতদের একাংশ লক্ষ্মীর হয়ে ঝগড়া করেন। কেন স্ত্রীকে ফেলে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন জগন্নাথ। এ তর্কে রীতিমাফিক জগন্নাথের প্রতিনিধির হার হয়।

জগন্নাথ মন্দিরে ঢুকতে না পেরে বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন বলে একটা সময়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না মুখ্য দয়িতাপতি। ‘পরেরবার আর এমন ভুল হবে না’ বলে স্বামীর পক্ষ থেকে আশ্বাস পেয়ে লক্ষ্মীর মন গলে। মন্দিরের রত্নভাণ্ডারের কাছে লক্ষ্মী-নারায়ণের পুষ্পাঞ্জলি পূজার পরেই স্ত্রীকে রসগোল্লা-ভোগ অর্পণ করেন জগন্নাথ। পুরী মন্দিরের এই ঐতিহ্যকে ধরেই উড়িশ্যার দাবি, রসগোল্লা তাদের আবিষ্কার।