কর্মকর্তাদের নির্দেশেই পৈশাচিক নৃংশসতা, অংশ নেয় ৭ কিশোর অপরাধীও

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন বন্দি নিহত ও ১৫ জন জখমের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী তত্ত্বাবধায়কের নির্দেশেই এ পৈশাচিক নৃশংসতা চালানো হয়। নির্যাতনে তাদেরই আশীর্বাদ-পুষ্ট অন্তত সাত কিশোর অপরাধীও অংশ নেয়।

১৮ জন বন্দি কিশোর নির্যাতনে জ্ঞান হারালেও টানা ছয় ঘণ্টা কোনও চিকিৎসা ছাড়াই ফেলে রাখা হয়। এতে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

পুলিশ হেফাজতে কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক (সহকারী পরিচালক), সহকারী তত্ত্বাবধায়কসহ ১০ কর্মকর্তা কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক তদন্তে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার সত্যতা পাওয়ায় কেন্দ্রের পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

শনিবার দুপুরে নিজ দফতরে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন- শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক (সহকারী পরিচালক) আবদুল্লা আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক (প্রবেশন অফিসার) মাসুম বিল্লাহ, কারিগরি প্রশিক্ষক (ওয়েল্ডিং) ওমর ফারুক, ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর একেএম শাহানুর আলম, সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর মো. মুশফিকুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেন বলেন,গত ৩ আগস্ট কিশোর বন্দী হৃদয়কে (যে চুল কাটায় পারদর্শী) চুল কেটে দিতে বলেন কেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রধান (হেড গার্ড) নূর ইসলাম। ঈদের আগে হৃদয় প্রায় দু’শ বন্দীর চুল কাটায় তার হাত ব্যথা উল্লেখ করে চুল কাটতে অস্বীকৃতি জানায়।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নূর ইসলাম কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহর কাছে অভিযোগ করেন, ‘ওরা ট্যাবলেট খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে রয়েছে।’ এছাড়াও তিনি হৃদয় ও তার বন্ধু পাভেলের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত করেন। সেখানে উপস্থিত কিশোর নাঈম অভিযোগ শুনে বিষয়টি পাভেলকে জানিয়ে দেয়।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পাভেল তার কিছু অনুসারী কিশোরকে নিয়ে নূর ইসলামকে মারধর করে। এতে তার হাত ভেঙে যায়। কেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হেডগার্ডকে মারধরের ঘটনায় জড়িত ১৩ জনকে শনাক্ত করে কর্তৃপক্ষ।

এরপর গত ১৩ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা ডাকা হয়। ওই সভায় মোট ১৯ জন উপস্থিত ছিলেন। সেখান থেকে অভিযুক্তদের শাস্তির নির্দেশ দেয়া হয়।

ওইদিন বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তত্ত্বাবধায়ক ও সহকারী তত্ত্বাবধায়ক অভিযুক্ত বন্দিদের চড় থাপ্পড় মারেন। এরপর কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাদের আশির্বাদপুষ্ট ৭-৮ জন কিশোর (ইমরান, পলাশ, মোহাম্মদ আলী…) নেতৃত্বে বন্দিদের মুখে গামছা ঢুকিয়ে জানালা দিয়ে হাত বাইরে বের করে টেনে ধরে পেছনে বেধড়ক মারধর করা হয়। লোহার রড, ক্রিকেট স্ট্যাম্প ইত্যাদি দিয়ে বেপরোয়া পেটানো করা হয়। অচেতন হয়ে গেলে বন্ধ করে ফের জ্ঞান ফিরলে আবার মারধর করা হয়।

পালাক্রমে এভাবে মারধরের পর গুরুতর জখম অবস্থায় এদের একটি ঘরে ফেলে রাখা হয়। একজন ‘কম্পাউন্ডার’ দিয়ে সামান্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও এদের হাসপাতালে না পাঠিয়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা ফেলে রাখা হয়।

পুলিশ, জেলা প্রশাসন কিংবা সমাজসেবা অধিদফতরের কাউকে বিষয়টি জানায়নি কেন্দ্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। সন্ধ্যায় সাড়ে ৬টার দিকে একজন বন্দি মৃত্যুর পথযাত্রী হওয়ায় তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর আমরা জানতে পারি।

খবর পেয়ে আমি (পুলিশ সুপার), জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন কেন্দ্রে যাই। সেখানে ঢুকে ডরমেটরিতে দেখি আহত বন্দিরা যন্ত্রণায় কাতর। পুলিশের পিকআপ ও সিভিল সার্জনের দেয়া অ্যাম্বুলেন্সে আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসক তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

এই ঘটনায় শুক্রবার ভোরে কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়কসহ ১০ কর্মকর্তা কর্মচারীকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাঁচজনের সংশ্লিষ্টতার সত্যতা পাওয়া গেছে। ১৪ আগস্ট সন্ধ্যারাতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যশোর কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন নিহত পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮) পিতা খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়া।

মামলায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করা হয়। মামলার পর পুলিশ হেফাজতে নেয়া ১০ কর্মকর্তা কর্মচারীর মধ্যে ৫ জনকে গ্রেফতার করে।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, ঘটনার দিন ওই মিটিংয়ে ১৯ জন উপস্থিত ছিলেন। ১০ কর্মকর্তাকে হেফাজতে ও অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে ৫ জন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার সত্যতা পাওয়া গেছে। নির্যাতনে অংশ নেয়া ৭-৮ জন কিশোরের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গেছে।

তারা দীর্ঘদিন ওই কেন্দ্রে থাকায় কর্মকর্তাদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিল। সার্বিক বিষয়ে তদন্ত হবে। যাচাই বাছাই করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। যাতে কেউ অহেতুক হয়রানির শিকার না হয়, সেই বিষয়টি শুরু থেকেই গুরুত্ব দিচ্ছি।

এসপি আরও বলেন, সমাজসেবা অধিদফতর ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি তদন্ত কমিটির পাশাপাশি পুলিশও মামলার তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। ওই মিটিংয়ে থাকা ১৯ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জড়িত হিসেবে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত হওয়ায় ৫ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তাদেরকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড আবেদন করা হবে। এছাড়াও জড়িত ৭-৮ কিশোর বন্দীকে এই মামলায় আইনের আওতায় আনতে আদালতে আবেদন করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) তৌহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম রাব্বানী, যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মনিরুজ্জামান প্রমুখ।