শিক্ষা ব্যবস্থাকে বঙ্গবন্ধু দেখতেন উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে

অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে আমাদের কাক্সিক্ষত মুক্তি উপহার দিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন, আসল মুক্তি আসবে উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে আর শিক্ষার প্রধান নিয়ামক হলো শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থা। তিনি বলেছিলেন, ‘আগামী প্রজন্মের ভাগ্য শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করছে। শিশুদের যথাযথ শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটলে কষ্টার্জিত স্বাধীনতা অর্থহীন হবে।’ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই, শিক্ষা উপকরণ ও খাবার বিতরণের প্রথম উদ্যোগও তিনি গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবরে দেওয়া এক টেলিভিশনে ভাষণে তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাখাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না।…দারিদ্র্য যেন উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেধাবীদের জন্য বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।’
এই উপলব্ধিকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য তিনি ১৯৭২ সালে শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ কুদরাত-ই-খুদার নেতেৃত্বে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন ও ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন আইন পাস করেন। ব্যাপক সংখ্যায় প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, নতুন বিদ্যালয় স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে তিনি সামরিক খাতের থেকেও শিক্ষাখাতে ৭ শতাংশ বেশি বরাদ্দ দেন।
শিক্ষকদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অগাধ শ্রদ্ধাবোধ থেকেও বোঝা যায় তিনি শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দিতেন। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষককে ছাত্ররা কিছু দাবি নিয়ে ঘেরাও করে। খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষকদেরক উদ্ধার করেন। শিক্ষার্থীরা বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, যাঁরা শিক্ষকদের সাথে বেয়াদবি করে তিনি তাদের সাথে কোনো কথা বলবেন না। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বেজেন্দ্রনাথ সূত্রধর ও সহপাঠ সৈয়দ নুরুল হক ঢাকায় তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য বাসভবনের গেটে উপস্থিত হলে বঙ্গবন্ধু নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে খবর পান এবং সব নিয়মকানুন উপেক্ষা করে নিজেই ছুটে আসেন এবং স্যারের পা ছুঁয়ে সালামের পর বুকে জড়িয়ে ধরেন। বঙ্গবন্ধু সেই শিক্ষককে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিজের চেয়ারে বসিয়ে উপস্থিত মন্ত্রী, এমপিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গর্বভরে বলেছিলেন, ‘আমার শিক্ষক’। ১৯৭৪ সালে একবার তিনি নোয়াখালী জেলা সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে জানতে পারেন, একজন বৃদ্ধ শিক্ষক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি চায়। বিষয়টি কানে পৌঁছামাত্র তিনি সেই শিক্ষককে তার কাছে আসার অনুমতি দেন। সেখানেই তাঁর সাথে রাতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার সময়ও বঙ্গবন্ধু তাঁর শিক্ষক অধ্যাপক সাইদুর রহমানের পায়ে হাত দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। শিক্ষক সমাজকে তিনি এভাবে দেখেছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমিও দেখেছি, তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাও তাঁর শিক্ষকদেরকে কীভাবে সম্মান করেন।
বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ব্যবস্থাকে দেখতেন দেশের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শিক্ষাকে উন্নতির চাবিকাঠি হিসেবে দেখেন। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে উন্নত শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে অপরাজনীতি থেকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতির নামে এখন যা চলছে তা বঙ্গবন্ধু আর তাঁর কন্যার আদর্শের সাথে মেলে না।
২০১৮ সালের শেষের দিকে আমি ভারতের পুনেতে ইনেটেলেক্টচুয়াল প্রপার্টি রাইট বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণের জন্য গমণ করি। আমাদের সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনৈক শিক্ষক-গবেষকও অংশগ্রহণ করেন। সেখানে ভারতের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার রঘুনাথ মাশালকারকে বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল জিজ্ঞাসা করেন, বাংলাদেশ এবং ভারতের রাজনৈতিক পরিমÐল একই হওয়া সত্তে¡ও আপনারা বিজ্ঞানে এতো এগিয়ে গেলেন কীভাবে? স্যার রঘুনাথ মাশালকার উত্তর দিলেন, ‘আমাদের রাজনীতিবিদেরা বাইরে যাই-ই করুন না কেন, তারা শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ করেন না। এ জন্য ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বকীয় ধারা ও কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শিক্ষা ও গবেষণায় সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে।
১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সাহিত্য সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি সর্বত্রই একটি কথা বলি, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। সোনার মানুষ আকাশ থেকে পড়বে না, মাটি থেকেও গজাবে না। এই বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্য থেকেই তাঁদের সৃষ্টি করতে হবে।’ আর সেই সোনার মানুষ গড়ার কারিগর হল শিক্ষক এবং সেই কারখানা হল শিক্ষালয়। জাতির পিতার আদর্শ, চিন্তা-চেতনায় বলীয়ান হয়ে, আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হলে আমরা এক সময় ভারতসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারব, ইনশাল্লাহ।

লেখক :উপাচার্য, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়