একে একে মহাপ্রয়াণে রাজনীতির তিন বটবৃক্ষ

ব্যুরো রিপোর্ট: যশোরের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিন বাল্যবন্ধু। তারা ভিন্ন আদর্শের রাজনীতি চর্চা করলেও প্রত্যেকেই ছিলেন জননেতা। তৃণমূলের হৃদস্পন্দন। সাধারণ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগতা ছিল ঈর্ষণীয়। রাজনীতি অঙ্গনের সেই তিন দীপশিখা একে একে নিভে গেল। সর্বশেষ রোববার (১০ জানুয়ারি) সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক এমপি বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ #খালেদুর_রহমান_টিটো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। এর আগে তার দুই বাল্যবন্ধু ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম ও ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই সাবেক এমপি আলী রেজা রাজু প্রয়াত হন। ষাটের দশকে অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের মধ্যদিয়ে তিনবন্ধুর রাজনীতিতে হাতেখড়ি। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় তিনবন্ধু সব সময় একই আদর্শের ছিলেন না। কখনো কখনো ভিন্ন আদর্শে পথ চলেছেন। রাজনীতির মাঠে ভোটের লড়াইয়ে ছিলেন প্রতিদ্ব›দ্বীও। বন্ধুর কাছে বন্ধুর জয়-পরাজয়ও হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে তিন বন্ধুই হয়েছেন যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য। রাজনীতির মাঠে কঠিন সময় পার করেছেন তারা। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কে তাদের কখনো ছেদ পড়েনি। সুখে-দুখে বন্ধু, বন্ধুর প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছেন। আলী রেজা রাজুর প্রয়াণে লাশের সামনে দাঁড়িয়ে দুই বন্ধু (তরিকুল-খালেদুর রহমান) ডুকরে কেঁদেছেন। শোককে শক্তিতে পরিণত করেছেন। তরিকুল ইসলামের মৃত্যুর পর বাড়িতে ছুটে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন খালেদুর রহমান টিটো। দুই বন্ধুর প্রয়াণ তাকে ব্যথিত করেছে। কালের ¯্রােতে তিনিও চিরবিদায় নিলেন। তরিকুল ইসলাম ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য,সাবেক মন্ত্রী। অপর বন্ধু আলী রেজা রাজু জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদস্য সদস্য ছিলেন।এই তিন রাজনীতিবিদের শূণ্যতা অনুভব করবে যশোরবাসী।
খালেদুর রহমান টিটো:
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ খালেদুর রহমান টিটো ১৯৪৫ সালের ১ মার্চ কোলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম এ্যাডভোকেট হবিবুর রহমান। মাতা মরহুম করিমা খাতুন। সাত ভাইবোনের মধ্যে টিটো দ্বিতীয় স্থানে। ১৯৬৩ সালে যশোর এম.এম. কলেজ সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ইউনিয়নে সম্পৃক্ততার মধ্যদিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত হন। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করেন। ১৯৬৭ সালে কলেজের লেখাপড়া শেষে করে তিনি শ্রমিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরে তিনি মটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হন। তিনি ঐ সময়ে শ্রমিকদেরকে সংগঠিত করতে সমর্থ হন। ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে তিনি কৃষক আন্দোলন জোরদার করতে কোটচাঁদপুর, মহেশপুর ও কালীগঞ্জ এলাকায় ভ্রমণ করেন। ১৯৭০ সালের শেষের দিকে তাঁর সাথে দলের রাজনৈতিক মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। শ্রেণী শত্রæ উৎপাটনের পদ্ধতিকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। ফলে এক সময়ে দল থেকে বের হয়ে আসেন। এসময় তিনি পুলিশি অভিযানের কারণে কুষ্টিয়াতে চলে যান। ঐ বছরের মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আবার ভারতে চলে যান। বাম রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার কারণে সেখানে তিনি শান্তিতে থাকতে পারেননি আবার প‚র্ব পাকিস্তানেও ঢুকতে পারতেন না। এর কারণ হিসেবে ঐ সময় পাক আর্মি তাঁর মাথার দাম ধার্য করেছিলো ১০ হাজার টাকা। ১৯৭৪ সালের প্রথম দিকে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী-ন্যাপ) এ যোগদান করেন। ৭৪ সালেই ন্যাপের জেলা সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ৭৭ সালে ন্যাপের যশোর অঞ্চলের সভাপতি প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ আলমগীর সিদ্দিকী মারা গেলে তিনি ন্যাপের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় তিনি ন্যাপের পক্ষ থেকে তাঁকে সমর্থন করেন। নির্বাচনের পর বিএনপি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হলে তিনি ন্যাপের সাথেই থেকে যান। ১৯৮১ সালে ‘গণতান্ত্রিক পার্টি’ গঠিত হলে তিনি এই রাজনৈতিক দলের সথে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে পৌরসভার নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে জাতীয় পার্টি গঠিত হওয়ার পর ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি পক্ষ থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালের মে মাসে তিনি শ্রম ও জনশক্তি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সরকার পতনের ফলে ১৯৯১ সালে তাঁকে জেলে যেতে হয়। এ সময় তিনি জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯১ সালে দলকে নতুনভাবে সাজানো হলে তিনি কারাগারে থাকাকালীন কৃষি বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৯১ এর শেষে জাতীয় পার্টির মহাসচিব হন এবং ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি মনোননয়ন না পাওয়ায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। পরে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন। ২০০৬ সালে খালেদুর রহমান টিটো’কে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ২০০৮ সালের ২৯ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খালেদুর রহমান টিটো’র বাল্যশিক্ষা শুরু হয় যশোর জিলা স্কুলে। ১৯৬০ সালে এখান থেকে ম্যট্রিক পাশ করেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকার কায়েদে আজম কলেজ হতে ইন্টারমিডিয়ের পাশ করেন। ১৯৬৭ সালে কারাগারে অবস্থানকালে যশোর এম. এম. কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করেন। ১৯৭২ সালের ১৮ মে যশোর শহরের চুরিপট্টি এলাকার মেয়ে রওশন আরা বেগম বিন্তক এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তিনি তিন পুত্র সন্তানের জনক। স্ত্রী ২০০৭ সালে মারা যান। ছোটবেলায় খালেদুর রহমান একজন ভাল খেলোয়াড় ও একজন ভাল তবলাবাদক ছিলেন। তাঁর হাত দিয়ে যশোরের অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।
তরিকুল ইসলাম:
১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন তরিকুল ইসলাম। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে যশোর এমএম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের জন্য রাজবন্দি হিসেবে যশোর ও রাজশাহীতে কারাভোগ করেন দীর্ঘ নয় মাস। ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় গ্রেপ্তার হন। ১৯৭০ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভাসানী আহূত ফারাক্কা লং মার্চেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। ভাসানী ন্যাপ থেকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) হয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির ৭৬ সদস্যবিশিষ্ট প্রথম আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য তরিকুল ইসলাম। সেই সঙ্গে বিএনপির যশোর জেলা আহ্বায়কের দায়িত্ব পান। ১৯৮০ সালে জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে পর্যায়ক্রমে তিনি দলের যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, ভাইস চেয়ারম্যান ও ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে স্থায়ী কমিটির সদস্য পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭৩ সালে যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তরিকুল ইসলাম নাম লেখান জনপ্রতিনিধির খাতায়। ১৯৭৮ সালে যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে যশোর সদর আসন থেকে এমপি নির্বাচিত ও ১৯৮১ সালে সড়ক ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান । পরের বছর হন পূর্ণমন্ত্রী। ১৯৯৪ সালের উপ-নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্ব›দ্বীতায় এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর দায়িত্ব পান ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন তরিকুল। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পর্যায়ক্রমে খাদ্য, তথ্য এবং বন ও পরিবেশমন্ত্রীর দায়িত্বপালন করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি বন্ধু খালেদুর রহমান টিটোর কাছে পরাজিত হন । বিএনপি ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করায় প্রার্থী হননি তিনি। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম মারা যান।
আলী রেজা রাজু :
এক সময় বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন আলী রেজা রাজু। তিনি এই দলটির যশোর জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি থেকে যশোর-৩ (সদর) আসনে মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আওয়ামী লীগে যোগদানের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে দলটি তাকে যশোর সদর আসনে প্রার্থী মনোনীত করে এবং ওই নির্বাচনে তিনি ঘনিষ্ঠ দুই বন্ধু বিএনপির তরিকুল ইসলাম এবং জাতীয় পার্টির খালেদুর রহমান টিটোকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য ছাড়াও আলী রেজা রাজু স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যশোর পৌরসভার কমিশনার (বর্তমানে কাউন্সিলর), সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদেও চেয়ারম্যান, যশোর সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান (বর্তমানে মেয়র) হিসেবে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগে যোগদানের পর তিনি দলটির সাধারণ সদস্য হিসেবে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন কয়েক বছর। পরে ২০০৪ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতি হিসেবে তিনি ২০১৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই তিনি মারা যান।#