স্বগত সংলাপ: নিও নরমাল-৩


                                                                         অধ্যাপক আবদুল হাই

অধ্যাপক আবদুল হাই: ভোর থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। পাশের বাসার টিনের চালে বৃষ্টিপতনের ঝমঝম শব্দ নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে। চরাচর জুড়ে অসীম নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। এ শহরটা যেন আজ ভেসে যাবে। এমন পরিবেশ বোধহয় রবীন্দ্রনাথ কেও মোহগ্রস্ত করেছিল । তাই তো তিনি লিখেছিলেন,
“এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।”
কিন্তু এখন তো বর্ষাকাল নয় । হেমন্তের শুরুতে এরকম বৃষ্টি মিস্টার রফিককে চিন্তায় ফেললো। মধ্য অক্টোবরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে পরপর দুটি লঘুচাপ , অঝোর বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া দেশ, অস্বাভাবিক ঠেকছে। এই বৃষ্টিতে যদি করোনার স্পাইক সহ করোনা ব্যবসায়ীরা তলিয়ে যেত ! এই অর্ধমৃত জনপদে প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসত ! এসব ভাবতে ভাবতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মিস্টার রফিক অফিসে যাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলেন।
অফিসের উদ্দেশ্যে যখন গাড়িতে করে কারওয়ান বাজারে আসলেন , দেখলেন বসুন্ধরা সিটি থেকে হাতিরপুল এবং হাতিরপুল থেকে শেরাটন অভিমুখী সবগুলো রাস্তায় গাড়িগুলো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে ভেবেছিলেন জল জটের কারণে । একটু পরে যা জানলেন মিস্টার রফিককে তা প্রচন্ড ব্যথিত করলো । করোনাজনিত লকডাউন এর কারণে দেশে আটকে পড়া প্রবাসী শ্রমিকরা সৌদি আরবের ভিসা ও টিকিট জনিত জটিলতায় রাস্তা অবরোধ করেছে। উৎকন্ঠিত , পরিশ্রান্ত শ্রমিকরা রোদ ,জল , কাদায় মাখামাখি হয়ে রাস্তায় বসে আছে একটা এয়ার টিকিটের আশায় । কারো ভিসার মেয়াদ রয়েছে এক সপ্তাহ । কারো বা পনেরো দিন । একটা টিকিট না পেলে হাজারো স্বপ্নের মৃত্যু ঘটবে। করোনা এভাবেই বিশ্বজুড়ে শ্রমের গতিশীলতায় ছেদ টেনে দিয়েছে। দেড় ঘন্টা অপেক্ষার পর যখন সবুজ আলো জললো, ততক্ষনে মিস্টার রফিক গাড়ির এসিতেও ঘামতে শুরু করেছেন । যত দ্রুত সম্ভব তাঁর অফিসে পৌঁছানো দরকার । বসের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শের পর বিদেশি কনসার্নদের সঙ্গে তাঁর আজ গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও কনফারেন্স করার কথা। সেটি ঠিক মত করতে না পারলে প্রবাসী শ্রমিকদের মত তাঁর স্বপ্নের ও মৃত্যু ঘটতে পারে।
কিছু দূরে এসে শাহবাগের কাছে সাকুরা মোড়ে আবারও হোঁচট খেলেন। নারী নির্যাতন বিরোধী আন্দোলনে এখানে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ড্রাইভারকে বাঁয়ে টার্ন নিতে বলে মিস্টার রফিক ঘড়ির দিকে তাকালেন। গাড়িতে বসেই প্রয়োজনীয় মেইল করে ব্যবসায়িক সহযোগীদের মিটিং এর বিষয়ে আশ্বস্ত করলেন । করোণাজনিত কারণে ব্যবসা যখন তলানিতে এসে ঠেকেছে ,তখন আজকের ডিল টা তাঁদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে যখন অফিসে পৌছলেন মিস্টার রফিক , ঘড়িতে তখন বারোটা। বৃষ্টির তীব্রতা কমেছে। আকাশ খানিকটা পরিষ্কার হয়েছে । রাস্তায় জন চলাচল ও বৃদ্ধি পেয়েছে । অফিসে ঢুকতেই রিসেপসনিস্ট নিপার মিষ্টি চাহনি স্বস্তি এনে দিলো। নির্জন অফিসের এক কোণে হোসেন আলীকে ঝিমোতে দেখলেন । টেকনিশিয়ান রনিকে কনফারেন্সিং এর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে ফ্রেশ হয়ে বসতে যাবেন এমন সময়ে বসের কল পেলেন।
ভীরু পায়ে বসের রুমে প্রবেশ করতেই শুনতে পেলেন, “রফিক সাহেব বায়ার’রা আমাদের ডিল টা একসেপ্ট করেছে । প্রোডাকশন শুরু করুন।”
মিস্টার রফিকের দেহে যেন প্রাণ ফিরে এলো। গত এক সপ্তাহের অক্লান্ত পরিশ্রম , দফায় দফায় মিটিং, মেইল চেকিং, স্যাম্পল স্পেসিফিকেশন পাঠানো, বায়ারদের সঙ্গে নেগোসিয়েশন সব যেন সার্থক হল। নিমেষেই যেন সব উৎকণ্ঠা ও ক্লান্তির অবসান হলো। নিজেই নিজেকে বলে উঠলেন , ” রফিক আজ সন্ধ্যায় তুমি সেলিব্রেট করতেই পারো।”

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।