স্বগত সংলাপ: নিও নরমাল-৪

অধ্যাপক মো. আব্দুল হাই: হাতের কাজ শেষ করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। অফিস থেকে সবাই বেরিয়ে গেছে শুধু তিনি ছাড়া। হোসেন আলী ‘কে অস্থির দেখাচ্ছে। কাচুমাচু অবয়বে সামনে এসে বললো , ” স্যার, বাচ্চার মা ফোন দিয়েছে , বাসায় গেস্ট এসেছে । বাজারে যেতে হবে ।” মিস্টার রফিক একটু যেন বিরক্ত হলেন। এখনো কিছু কাজ বাকি আছে । আরো কিছুক্ষণ থাকতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু হোসেন আলীর তাগাদা অস্বস্তি দিচ্ছে। বিকেল চারটা’র পর থেকে অফিসের সবাই যেন হঠাৎ করে অস্থির হয়ে ওঠে । যতটা না অফিসের কাজের প্রয়োজনে , তার চেয়ে বেশি অফিস থেকে বেরোনোর ছুতায় । কারো ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট রয়েছে , কারো শপিং বাকি , কেউ বেবির খেলনা কিনতে যাবে, আবার কারো জন্যে কেউবা কোথাও অপেক্ষা করছে । শুধু কাজ পাগল মিস্টার রফিকের যেন অফিস ছাড়া কোন গন্তব্য নেই।

অফিস থেকে যখন বেরোলেন , তখন ঘড়ির কাঁটা ছ’টা ছুঁই ছুঁই । সূর্য অস্ত গেছে অনেক আগেই । রাস্তার নিয়ন বাতিগুলো দ্যুতি ছড়াচ্ছে । ঝাঁ চকচকে রাস্তায় গাড়িগুলো সাঁই সাঁই করে করে ছুটে চলেছে। কারো সঙ্গে কথা বলার দু’দণ্ড সময় যেন নেই । গাড়িতে উঠে প্লেয়ারে গান চালিয়ে দিলেন মিস্টার রফিক –

দিশাহীন চোখে খুঁজে যাই
শুধু খুঁজে যাই কি আশায়
এ শহর বড় অচেনা
কেউ বোঝে না তাকে হায় – – – – – –
মনোময়ে’র আবেগি কন্ঠের রেশ না কাটতেই সিগনালে দাঁড়িয়ে পরলো গাড়ি। দেখলেন গাড়ির জট পেরিয়ে একদল পথশিশু হাতে মাস্কের বক্স নিয়ে দ্রুত পায়ে তাঁর গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। আগে পৌঁছানো নিয়ে তাদের মধ্যে মৃদু বচসাও হয়ে গেল। অবশেষে মলিন পোশাকের দ্বাদশ বর্ষীয়া সুশ্রী চেহারার মুখে মাস্ক পরিহিত মেয়েটি জানালায় এসে নক করলো । “স্যার মাস্ক নিবেন? নিন না একটা । করোনা হবে না।” মেয়েটির করুণ চাহনি এবং বলার ধরনে কি যেন একটা হয়ে গেল । তার সচেতনতা ও তাঁকে মুগ্ধ করলো। তাই প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও মিস্টার রফিক মাস্ক ক্রয় করলেন। অবচেতন মনে নিজেকে প্রশ্ন করলেন , ” তিনি কি মেয়েটিকে করুণা করলেন ? এভাবে কতজনকে তিনি সাহায্য করতে পারবেন !” মনে পরলো করোনা পূর্ব সময়ে এই শিশুরা ফুল এবং অন্যান্য নিত্যপণ্য সিগন্যালগুলোতে ফেরি করে বেড়াতো । করোণা এসে সব পাল্টে দিয়েছে। এখন সিগন্যালগুলোতে ফুলের দেখা পাওয়া যায় না। কিন্তু তাঁর তো আজ ফুল দরকার । আশেপাশে কোথাও ফুল না পেয়ে তিনি ড্রাইভারকে কোন একটা ফুলের দোকানের পাশে গাড়ি পার্ক করতে বললেন।

সুসজ্জিত দোকানের স্লাইডিং ডোর পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই ফুলের মিষ্টি গন্ধে সারা দিনের ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেল । তাঁকে দেখে ক্রেতাশূন্য ফুল দোকানি তৎপর হয়ে উঠলেন। মিস্টার রফিক জিজ্ঞেস করলেন ;

দোকান ফাঁকা কেন?
এখন তো কেউ ফুল কেনে না স্যার।
কেন?
করোনায় কোন অনুষ্ঠান হয় না, তাই।
তাহলে তো অনেক সস্তায় নিতে পারবো ,
স্যার কোনগুলো নিবেন? দাম কমিয়ে রাখবো, নিন।

কিন্তু দাম শুনে মিস্টার রফিকের অস্বাভাবিক মনে হল। তিনি ভাবতে থাকলেন কারণটা কি? চাহিদা না থাকলে তো মূল্য কমে যাওয়ার কথা। এক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটছে কেন ? এ কি চাহিদা ও সরবরাহের চিরন্তন অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ , নাকি অন্য কিছু ? মনে পড়লো কিছুদিন আগে যেন পত্রিকায় পড়েছিলেন, চাহিদা না থাকায় যশোর ও ধামরাইয়ের ফুলচাষীরা সবজি চাষে মনোযোগী হয়েছে । গত সাত মাসে দেশে কত মানুষের পেশা পরিবর্তন হয়েছে , বিবিএস তা জরিপ করে দেখতে পারে।

অবশেষে ফুল নিয়ে যখন বাসায় পৌঁছালেন , তখন অবসন্ন দেহ যেন মনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। শরীরের তাপমাত্রাও কি একটু বেশি মনে হচ্ছে ! শরীরের মধ্যে যেন একটা দ্রুত পরিবর্তন টের পেলেন। রাতে ভোজনবিলাসের যে পরিকল্পনা করে তিনি এতক্ষণ নিজেকে উজ্জীবিত করেছিলেন , তাতে জল ঢালতে হলো । দ্রুত পোশাক পরিবর্তন করে একটা প্যারাসিটামল খেয়ে নিলেন। ঘরের আলো নিভিয়ে বিছানায় গেলেন । আগামীকাল সকালে বোধহয় তাঁকে করোনা পরীক্ষা করাতেই হবে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।