স্বগত সংলাপ: নিও নরমাল-৫

অধ্যাপক মো.  আবদুল হাই: প্রচন্ড জ্বরে শরীরটা কুঁকড়ে যাচ্ছে। শীত থেকে বাঁচার জন্য গায়ে কাঁথা জড়িয়ে নিলেন মিস্টার রফিক। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য বেড সাইড টেবিলে রাখা গ্লাসের দিকে হাত বাড়ালেন ।হাতের ধাক্কায় গ্লাসটি সশব্দে নিচে পড়ে গেল। বিছানা থেকে দ্রুত নামতে গিয়ে ভাঙ্গা কাঁচের আঘাতে পা কেটে গেল। গ্লাসের ভাঙ্গা কাঁচ, পা থেকে নির্গত রক্ত ও পড়ে যাওয়া পানিতে পুরো মেঝে একাকার হয়ে গেল। একদিকে জ্বরের তীব্রতা, অন্যদিকে টুকরো কাঁচের আঘাতে অস্ফুটে মিস্টার রফিকের মুখ থেকে উচ্চারিত হলো “মা — – মাগো”
মধ্য রাতের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে এই শব্দ যেন ঘরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো “মা— মাগো- – – -।” কিন্তু তাঁর কপালে হাত ছোঁয়ানোর জন্য অথবা পায়ে ব্যান্ডেজ বেধে দেয়ার জন্য কেউ নেই এখানে। মা গত হয়েছেন সেই কবে । অথচ এখনও যেকোনো কষ্টের মুহূর্তে মায়ের কথাটাই সবার আগে মুখে আসে কেন ? এই সব ছাইপাশ ভাবনাকে সরিয়ে রেখে মিস্টার রফিক নিজেই ফার্স্ট এইড বক্স থেকে স্যাভলন , তুলা,গজ নিয়ে ক্ষতস্থান বাঁধার চেষ্টা করলেন। থার্মোমিটার দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা পরখ করলেন। মেঝে থেকে ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো ও পানি অপসারণ করলেন । অবশেষে পানি পান করে যখন আবার বিছানায় ফিরে আসলেন , তখন মসজিদ থেকে ফজরের আযানের সুমধুর সুর ভেসে আসছে। রাতের অন্ধকার ও একটু যেন ফিকে হয়ে আসছে। আর মিস্টার রফিক অপেক্ষা করছেন সূর্যোদয়ের । কারণ সকালে হসপিটালে যেতে হবে করোনা টেস্টৈর জন্য।

বসের ফোন কলে সকালে ঘুম ভেঙে গেল। বসের জলদ গম্ভীর কণ্ঠে আজ উদ্বিগ্নতা ধরা পড়ল । কিছুটা স্নেহ ও যেন ঝরে পড়ল । বললেন , “মিস্টার রফিক ভয় পাবেন না। কিচ্ছু হবে না । আমি সব ঠিক করে রেখেছি। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিন ।” ড্রাইভারের অতি সতর্ক চালনায় প্রায় নির্বিঘ্নে হসপিটালে পৌঁছে গেলেন। তবে শাহবাগের কাছে জটলা দেখে জানতে পারলেন নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান পরিচালনা করছেন। লক্ষ্য করলেন মুখে মাস্ক বিহীন কিছু লোককে আলাদা করা হয়েছে জরিমানা করার জন্য । করোণা প্রতিরোধে প্রশাসনের তৎপরতায় কিছুটা স্বস্তি বোধ করলেন তিনি। অনলাইন রেজিস্ট্রেশন এর কোড দেখিয়ে যখন কিউতে দাঁড়ালেন , ততক্ষণে অপেক্ষমানদের সিরিয়াল হসপিটালের গেট পেরিয়ে হাইওয়েতে গিয়ে ঠেকেছে। শিশু, যুবা ,বয়স্ক সহ সব বয়সের উপস্থিতি থাকলেও তাঁর বয়সের প্রাধান্য লক্ষ্য করলেন। প্রায় সবার সঙ্গে দু-তিনজন করে সাহায্যকারী রয়েছে শুধু তিনি ছাড়া।নমুনা প্রদান প্রত্যাশীদের শারীরিক দুর্দশার তুলনায় তাঁর অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থা তাঁকে আশাপ্রদ করল। কিন্তু পরীক্ষা প্রত্যাশীদের সংখ্যাধিক্য তাঁকে আতঙ্কগ্রস্ত করলো। তাহলে কি বিশেষজ্ঞদের অনুমান সত্যি হতে চলেছে? এই শীতে জাতি কি আবারও করোনার সর্বগ্রাসী রূপ প্রত্যক্ষ করতে চলেছে?

অবশেষে তাঁর পালা এলো। আপাদমস্তক পিপিই পরিহিত একজন স্বাস্থ্যকর্মী সোয়াব স্টিক নাকের মধ্যে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যখন নমুনা সংগ্রহ করতে থাকলেন, তখন মিস্টার রফিকের পৃথিবী ও যেন করোণা শব্দটিকে আবর্তিত করে ঘুরতে থাকলো । তিনি কি কিছুটা হলেও ভয় পেয়ে গেলেন ! যাই হোক না কেন এটুকু বুঝলেন যে , আপাতত দ্রুত তাঁকে হসপিটাল পরিত্যাগ করতে হবে । নইলে হয়তো সত্যি সত্যিই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে কোন কোলাহলমুক্ত রাস্তা দিয়ে এগোতে ইঙ্গিত করলেন। কিন্তু ততক্ষণে অফিস ফেরতরা আবার রাস্তায় নামতে শুরু করেছে। গাড়ির জট , যাত্রীর কোলাহল, সবজি বিক্রেতা ও হকারদের উৎপাত ঠেলে যখন বাসায় পৌঁছলেন তখন তিনি বিধ্বস্ত প্রায়।

সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে একমগ গ্রিন টি নিয়ে টিভির সামনে বসলেন মিস্টার রফিক। চ্যানেল সার্ফিংয়ে চোখ আটকে গেল সকালের সেই অভিযানের খবরে । নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক জরিমানা করা ব্যক্তিদেরকে স্পট রিপোর্টার প্রশ্ন করছেন। মিস্টার রফিক মনযোগ দিয়ে মাস্কবিহীনদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করলেন।

প্রশ্নঃ মাস্ক পড়েন নি কেন?
উত্তরঃ ১ম জন- শেষ হয়ে গেছে তাই;
২য় জন-হারিয়ে গেছে;
৩য় জন-দম বন্ধ হয়ে যায়,তাই;
৪র্থ জন-মাথা ব্যথা করে তাই;
৫ম জন-অনেক সচেতন, বাট ভুলে গেছি;
৬ষ্ঠ জন-এইতো পকেটে আছে;
৭ম জন-মুখে ছিল, মোটরসাইকেলের বাতাসে
উড়ে গেছে।
শেষোক্ত তিনজনের উত্তর মিস্টার রফিককে বিস্মিত করল । মনে হলো করোনা নিয়ে আমরা নিজেদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছি নাতো ! কিন্তু পরক্ষনে মনে হলো তিনি নিজে তো সব ধরনের সর্তকতা অবলম্বন করেছেন । তাহলে এত ভয় করছে কেন ? কে জানে আগামীকালের সকালটা তাঁর জন্য কি বার্তা বয়ে আনছে !

৩০.১১. ২০২০-বগুড়া , বাংলাদেশ।