স্বগত সংলাপ :নিও নরমাল (পর্ব-৬)

অধ্যাপক আবদুল হাই

অধ্যাপক মো: আব্দুল হাই : সকাল থেকেই সূর্যটা যেন আগুন ছড়াচ্ছে। সূর্যের এই আগুন চক্ষুকে উপেক্ষা করে পথে নামতে হবে, বাজারে যেতে হবে, এমনকি অফিসের ঝামেলা ও সামলাতে হবে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ঝুলবারান্দায় ভেজা কাপড় মেলতে গিয়ে মিস্টার রফিক দেখলেন অযত্নে বেড়ে ওঠা এডেনিয়ামের লাল রং স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে। অথচ সযত্নে লালিত অর্কিডের পাতাগুলো যেন পানি শূন্যতায় ভুগছে। বার বার স্প্রে করেও সজীব রাখা যাচ্ছে না। অদূরে রাস্তার কুকুরগুলোকে একটু হিমের পরশ পেতে ড্রেনের পাশে নিথর পড়ে থাকতে দেখলেন। মুঠোফোনের স্ক্রিনে গুগলের ওয়েদার ফোরকাস্ট বলছে স্থানীয় তাপমাত্রা এখন ২৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। সকাল ন’টায় এই তাপমাত্রা মিস্টার রফিকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলো। মানুষের ঘনত্ব, গাড়ির সংখ্যাধিক্যতা , জ্বালানির অবিবেচক ব্যবহার, নির্বিচার বন ধ্বংসের খবর মিস্টার রফিকের অজানা নয় । কিন্তু তাই বলে সকাল ন’টাতেই এই তাপমাত্রা ! বাজারের আগুন , অফিসের গুমোট , বায়ারদের প্রেসার, সর্বোপরি করোনার উল্লম্ফন চৈত্রের সকালের এই তাপমাত্রাকে দিনশেষে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে তা ভেবে মিস্টার রফিক শঙ্কিত হলেন । কিন্তু আপাতত এই উষ্ণ পরিবেশ থেকে মনকে শীতল করার জন্য মিস্টার রফিক প্রিয় কবি সব্যসাচী দেবের “চণ্ডালিকার” আবৃত্তি চালিয়ে দিলেন।

“চৈত্রের মধ্যদুপুরে পাখিরাও ডানা গুটিয়ে নেয়,
দূর শহরের রাস্তায় বাবুদের ভিড় নেই,
গাঁয়ের কুকুরগুলি ঢুকে যেতে চায় উঠোনের ছায়ায়,
আমাকে এখন যেতে হবে দূর নদীর চড়ায়,
বালি খুঁড়ে তুলে আনতে হবে ফোঁটা ফোঁটা জল,
তারপর ফিরে আসব খরায় ফাটা মাঠ ,শুকনো পুকুর
আর টলটলে জলে ভরা নতুন ইঁদারার পাশ দিয়ে
বাবুদের ইঁদারা ;
তৃষ্ণায় ডুবে যায় আমাদের গোটা গাঁ,
কুকুর আর মানুষের জিভ ঝুলে পড়ে,
আর বাবুদের ইঁদারায় বাবুদের ছেলেদের স্নান;
আমাদের শরীর জ্বলে যায় চৈত্রের খরায়।”

চৈত্রের দাবদাহে খরাপীড়িত জনপদের মানুষদের অসহায়ত্বের কি নিখুঁত বর্ণনা সব্যসাচী এখানে দিয়েছেন । কিন্তু ২০২১ এর এই চৈত্রের গরম, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দেশের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা ও করোনার ক্রমাগত উল্লম্ফনে অসহায় দেশের চিত্র কোন কবি কি তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন? এসব আবোল-তাবোল ভাবতে ভাবতে মিস্টার রফিক অফিসের পথে পা বাড়ালেন।

অফিসে প্রবেশ করতেই মিস্টার রফিক বসে’র কল পেলেন । বসে’র উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর মিস্টার রফিককে ভাবিয়ে তুললো।

মিস্টার রফিক , ই-ইউ থেকে মেইল এসেছে। দেখুন কি লিখেছে – ” আমাদের ওয়ার্কারদের করোণা থেকে সুরক্ষার জন্য কি ধরনের কমপ্লায়েন্স গ্রহণ করেছি , তা জানতে চেয়েছে।”

বসের রুম থেকে বেরিয়ে এসি’টা বাড়িয়ে দিলেন মিস্টার রফিক। গত কয়েকদিন থেকে করোনার সংক্রমণ ক্রমাগত বাড়ছিল । এবছর মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সংক্রমণকে বিশেষজ্ঞরা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বলছেন । বাতাসে গুজব ভেসে বেড়াচ্ছিল , আবার লকডাউন আসতে চলেছে । ইউরোপের অনেক দেশে অবশ্য আগে থেকেই আবার লকডাউন শুরু হয়েছে । এরকম অবস্থায় এমনিতেই শিপমেন্ট বজায় রাখা কঠিন । তার উপর বায়ারদের এরকম মেইল চৈত্রের দুপুরকে যেন আরো উত্তপ্ত করে তুললো। মনে পড়লো ওয়ার্কারদের মানবাধিকারের কথা চিন্তা করে ই-ইউ থেকে মাঝে মাঝেই এধরনের তথাকথিত কমপ্লায়েন্স মেইল এসে থাকে । মিস্টার রফিকের মনে হল শিপমেন্ট বাতিলের এটি নতুন কোনো বাহানা নয়তো !

টেকনিশিয়ান রনিকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের আয়োজন করতে বলে টেলিভিশন স্ক্রিনে চোখ রাখলেন মিস্টার রফিক। ততক্ষনে আগামী এক সপ্তাহ দেশব্যাপী লকডাউনের ব্রেকিং নিউজ চলে এসেছে। আন্তঃজেলা বাস কাউন্টারগুলোতে টিকিটের হাহাকার পড়ে গিয়েছে । হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে শ্বাসকষ্টজনিত কারণে অসহায় মৃত্যুর খবর দেখাতে শুরু করেছে নিউজ চ্যানেলগুলো। মনে পরলো অর্থনীতিবীদ ডঃ আহসান এইচ মনসুরের একটি উক্তির । ডঃ মনসুর বলেছেন গত এক বছরে স্বাস্থ্য খাতে প্রজেক্ট ইম্প্লিমেন্টেশন হয়েছে সবচেয়ে কম । মাত্র ২২ শতাংশ । আগামী লকডাউনে কি অবস্হা হবে তা ভাবতেই মিস্টার রফিকের শরীরে যেন অজানা আশঙ্কার শীতল স্রোত বয়ে গেল।

লকডাউনের দিনগুলিতে অফিসের জরুরী কাজগুলো চালু রাখার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে এবং হাতের কাজগুলো শেষ করে মিস্টার রফিক যখন অফিস থেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন ততক্ষনে রাস্তায় গাড়ির জট শুরু হয়েছে । বাজার থেকে চাল, ডাল ,তেল উধাও হতে শুরু করেছে । রাস্তায় বাজারের পোটলা হাতে জনস্রোত দেখা যাচ্ছে । ওষুধের দোকানের সামনে ভয়ার্ত মানুষের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ক্রয়ের কিউ বৃদ্ধি পেয়েছে । সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষার শিষ্টাচার না মানার প্রবণতাও যেন পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, বিরক্ত মিস্টার রফিক যখন বাসায় পৌছলেন তখন রাত প্রায় আটটা। পাশের বাসার মিউজিক চ্যানেল থেকে তখন রবীন্দ্র সংগীতের সুর ভেসে আসছে- –

“চৈত্রদিনে তপ্ত বেলা তৃণ আঁচল পেতে
শূন্যতলে গন্ধ ভেলা ভাসায় বাতাসেতে
বেনুর পাতা মেশায় গাঁথা নিরব ভাবনায়
শ্রান্ত ভালে যূথীর মালে পরশে মৃদু বায়।”

কিন্তু কোন কিছুই মিস্টার রফিককে শান্ত করতে পারছে না। একটা অজানা আশঙ্কা , একটা অজানা ভাবনা যেন ক্রমশ গ্রাস করছে। কে জানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের কোন সৈকতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় !