স্বগত সংলাপ: নিও নরমাল (পর্ব-৭)

অধ্যাপক আবদুল হাই

অধ্যাপক মোঃ আব্দুল হাই : প্রচণ্ড গরমে ঘুম ভেঙে গেল মিস্টার রফিকের। সেহেরির পরে মৃদু মন্দ ঠান্ডা হাওয়া ঘুমটাকে জাঁকিয়ে তোলে। ছুটির সকালের ঘুমকে প্রলম্বিত করার ইচ্ছে ছিল মিস্টার রফিকের। রমজানের সকালে নাস্তা তৈরির তাড়া নেই , অফিস যাওয়ার প্রস্তুতি নেই । তাই বিছানায় অলস যাপন মন্দ হত না। কিন্তু লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা আপাতত সে চিন্তায় ছেদ টেনে দিল । বাথরুমে গিয়ে তিনি দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিলেন। রান্নাঘরে আপৎকালীন খাবারের মজুদ পরীক্ষা করে নিলেন । রিডিং রুমের বুকসেলফ পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখলেন অযত্ন-অবহেলায় বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে ময়লার আস্তরণ জমে গিয়েছে । কতকাল প্রিয় বই গুলোর দিকে তাকানো হয়নি। কর্পোরেট জীবনের ব্যস্ততা তাঁকে যন্ত্রে পরিণত করেছে। একলা জীবনের আটপৌরে কাজগুলো তার সাংস্কৃতিক সত্তাকে যেন মেরে ফেলেছে। তিনি যেন ভুলতে বসেছেন, একদা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক দলের তিনি অপরিহার্য সদস্য ছিলেন। ভাবতে-ভাবতে ইলেকট্রিসিটি চলে এলো। বুকসেলফ থেকে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে একটি বই নিয়ে মিস্টার রফিক সোফায় বসে পড়লেন।

এটি সেই বই , দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত বইগুলোর একটি। “দ্য ডায়েরি অফ এ ইয়াং গার্ল” বা আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি নামে পরিচিত বইটিতে নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামের লুকানো কক্ষে দুই বছর যাবত ‘অটো ফ্রাঙ্ক ‘ পরিবারের আত্মগোপন, কিশোরী ‘আনা ফ্রাঙ্কের’ মানসিক অস্থিরতা, কল্পিত চরিত্র “কিটি” কে উদ্দেশ্য করে আনা’র ডায়েরি লিখন, যুদ্ধদিনের নানান স্মৃতিচারণ , নাৎসিদের নৃশংসতার বর্ণনা , বাইরে বের হতে না পারার হতাশা নিপুন ভাবে তুলে ধরা হয়েছে ; যা মিস্টার রফিককে গভীরভাবে স্পর্শ করল। মিস্টার রফিকের মনে হলো জাহানারা ঈমামের “একাত্তরের দিনগুলি” ও তো যুদ্ধদিনের ডায়েরি। ১৯৭১ সালের নয় মাসে ঢাকা শহরের অবরুদ্ধ জীবন , জ্যেষ্ঠ সন্তান রুমির যুদ্ধযাত্রা, পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা, ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর গেরিলা অপারেশন এবং সবশেষে স্বামী – সন্তান হারানোর যে মর্মস্পর্শী বর্ণনা জাহানারা ইমাম দিয়েছেন তা আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরির মতো সারা বিশ্বে কেন প্রচারের আলোয় এলোনা তা ভেবে মিস্টার রফিক ব্যথিত হলেন। তবে ঘটনা যাই হোক না কেন ১৯৪৪ সালে আমস্টারডাম শহরে অটো ফ্রাঙ্ক পরিবারের অন্তরীণ জীবনের করুণ পরিণতি কিংবা ১৯৭১ সালে ঢাকা শহরে শফি ইমাম পরিবারের অবরুদ্ধ জীবনের সঙ্গে বিগত এক বৎসর যাবৎ করোনাকালীন অবরুদ্ধতার কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পেলেন মিস্টার রফিক। সেই একই রকম অনিশ্চয়তা, ভয়ে ভয়ে বাঁচা, ভেঙেপড়া অর্থনীতি, থমকে যাওয়া উৎপাদন কর্মকাণ্ড, খুঁড়িয়ে চলা শিক্ষাব্যবস্থা , দারিদ্র্যের বিস্তার, এসবের শেষ কোথায় ? তবুও জীবনকে টেনে নিতে হয় কোন এক সার্থকতার দিকে । যেমন করে মিস্টার রফিক তাঁর অর্থহীন জীবনকে বয়ে বেড়াচ্ছেন । যেমন করে আনা ফ্রাংক ভেবেছেন আমস্টারডামের কোন এক ধূসর বিকেলে, “লাখো মানুষের যন্ত্রণা আমি বুঝতে পারি । তবু যখন আকাশের দিকে আমি তাকাই, তখন কেন জানি মনে হয় সব ঠিক হয়ে যাবে । মনে হয় এই নির্মম নিষ্ঠুরতার অবসান হবে। আবারো ফিরে আসবে শান্তি।”

একটি ফোন কল পেয়ে মিস্টার রফিকের এইসব বিক্ষিপ্ত ভাবনায় ছেদ পড়ল। বাসা থেকে জানানো হয়েছে ভাইজানের শ্বাসকষ্ট বেড়েছে। স্থানীয় ডাক্তার তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে বলেছেন । মনে পড়ল কয়েকদিন থেকেই ভাইজানের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। জ্বর ও গলা ব্যথায় ভুগছিলেন। সোয়াব টেস্টের রিপোর্ট না পাওয়ায় ভর্তি করা যাচ্ছিল না । আজ যে কোন উপায়েই হোক তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। ভাইজানদের রওনা দিতে বলে মিস্টার রফিক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করলেন, বসকে জানিয়ে রাখলেন এবং ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বললেন। ছুটির দিনের আলস্য ভেঙে উদ্বিগ্নমুখে মিস্টার রফিক রাস্তায় নামলেন। গাড়ি কিছুদূর অগ্রসর হতে মগবাজারের কাছে একটা বিক্ষোভের সম্মুখীন হলেন তাঁরা। দেখলেন রাস্তায় মোটরসাইকেল রেখে রাইড শেয়ারিং চালকরা আ্যপ বন্ধের প্রতিবাদে মানববন্ধন করছে। করোনা তাঁদের পথে বসিয়েছে। তাঁদের বিক্ষোভ মিস্টার রফিকের গতিকে রুদ্ধ করল। বিকল্প পথে কারওয়ান বাজারের কাছে পৌঁছে দ্বিতীয়বার বাধাগ্রস্ত হলেন । এখানে ছুটির দিনের নির্জনতা ভেঙে টিসিবির ট্রাকের সামনে মানুষের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করলেন। সস্তায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের জন্য এখানে রীতিমতো ধুন্ধুমার শুরু হয়েছে। অথচ এখানে রাস্তার উল্টোদিকে একদল দিনমজুর বৈশাখের কাঠফাটা রোদ উপেক্ষা করে কাজের সন্ধানে উদাস দৃষ্টিতে বসে আছে। টিসিবির পণ্য ক্রয়ের আগ্রহ ও সামর্থ্য কোনোটিই যেন তাঁদের নেই । মিস্টার রফিকের মনে পড়ল মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি গবেষণার কথা। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে কোভিড মহামারী বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে । বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। মন্দার কারণে বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার মান কমেছে । আয় কমে যাওয়ায় বিশ্বে মধ্যবিত্তের বড় অংশ দরিদ্র শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে। তাদের মতে কোভিডের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়বে ৭ কোটি ৮০ লাখ। কোভিডের আগে সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। বেসরকারি সংস্থা “সানেম ” এর জরিপ বলছে এই হার এখন ৪২ শতাংশ। কিন্তু আপাতত মিস্টার রফিককে রাইড শেয়ারিং চালকদের বিক্ষোভ , সস্তায় নিত্য পণ্য ক্রয়ের জন্য অপেক্ষমানদের চুলোচুলি অথবা দিনমজুরদের উদ্ভ্রান্ত অপেক্ষা কোনোটিই টানতে পারছে না। তাঁর কাছে এখন জীবিকা নয় , জীবন বাঁচানোটা এক নম্বর অগ্রাধিকার । যেভাবেই হোক তাঁকে আরো দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছাতে হবে।

নানান পথ ঘুরে উৎকণ্ঠিত মিস্টার রফিক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রবেশপথে পৌঁছে একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন। লক্ষ্য করলেন মধ্যবয়সী এক মহিলা রোগীর মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো । তাঁকে ঘিরে তাঁর শিশু সন্তানসহ একদল স্বজন কান্নাকাটি চিৎকার চেঁচামেচি করছে। কিন্তু তাঁকে সাহায্যের জন্য হাসপাতালের কেউ এগিয়ে আসছে না । চিৎকার ও ভিড় ঠেলে মিস্টার রফিক ভাইজানকে ভর্তির প্রয়োজনীয় ফরম পূরণ করে ডিউটি ডাক্তারের অনুমোদন নিয়ে যখন কোভিড ওয়ার্ডের দিকে অগ্রসর হলেন ; ততক্ষনে অক্সিমিটারে ভাইজানের অক্সিজেন স্যাচুরেশন চুরানব্বই এ নেমে এসেছে । বুকটা হাঁপড়ের মতো ওঠানামা করছে। অসহায় ভাবে তিনি তাকিয়ে আছেন। মিস্টার রফিক এর শ্বাস- প্রশ্বাস ও ঘন হতে শুরু করেছে । ওয়ার্ডে পৌঁছালে ভাইজানের অবস্থা দেখে অন্য রোগীদের মধ্যে যেন মৃদু চাঞ্চল্য বয়ে গেল। ভাবির আর্ত কান্না , মিস্টার রফিকের উদ্বিগ্ন প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কর্তব্যরত নার্স অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ভাইজানের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দিলেন। পেটে ও হাতে দুটো ইনজেকশন প্রয়োগ করলেন এবং তাঁকে সহ স্বজনদের বাইরে চলে যেতে বললেন।

ভাইজান এর শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হলে রাত দশটার দিকে মিস্টার রফিক বাসায় ফিরে এলেন। বরাবরই একলা জীবনে অভ্যস্ত মিস্টার রফিক। কিন্তু দেশব্যাপী কোভিড -১৯ এর থাবা এবং আজকের সন্ধ্যার বাস্তবতা যেন মিস্টার রফিককে মানসিকভাবে আরো একা করে দিয়েছে । কিছুই ভালো লাগছে না। একটা অজানা আশঙ্কা বুকে চেপে বসেছে । বাসাটাও কি আজ বেশি শূন্য মনে হচ্ছে ! বিক্ষিপ্ত মন কে শান্ত করতে তিনি টিভি চালিয়ে দিলেন। দেখলেন ডিডি বাংলার আর্কাইভ থেকে ভৈরবী রাগে মান্না দের কন্ঠ ভেসে আসছে- – –

সজল উদাস বায়ে বুকের কাছে
স্মরণের তারাগুলি ঘুমায়ে আছে
বিলাপের ভাঙ্গা সুর থেমে গেছে আঁধার বীনায়
কাজল মেঘের ভাবনায়
বাদলের এই রাত ঘিরেছে ব্যথায়
আমি আজ আকাশের মত একেলা
একেলা, একেলা।

কোভিড-১৯ যেন সবাইকে একলা করে দেওয়ার মিশনে নেমেছে ।

 

লেখক: অধ্যাপক মোঃ আব্দুল হাই
 বগুড়া , বাংলাদেশ।