রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন দৃষ্টি: জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

                                                                     অধ্যাপক আব্দুল হাই

অধ্যাপক মো. আব্দুল হাই : ভ্রূণের বিকাশ থেকে জৈবিক প্রক্রিয়ার স্থায়ী অবসান পর্যন্ত পৃথিবীতে মানবের যে পরিভ্রমণ, তার গতিপথ নির্ধারিত হয় কিভাবে । তা কি শুধু বংশগতির ফল, নাকি পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব, নাকি ধর্মবোধের ফলাফল। রবীন্দ্রনাথের জীবনে এসবের প্রকাশ কেমন ছিল , জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিই বা কেমন ছিল। মধ্যবয়সে লিখিত নৈবেদ্যর ‘জন্ম’ কবিতায় তিনি বলছেন;
“জীবনের সিংহদ্বারে পশিনু যে ক্ষনে ,
এ আশ্চর্য সংসারের মহা নিকেতনে,
সে ক্ষন অজ্ঞাত মোর ।”
সংসারের ঘাত-প্রতিঘাতে সে ক্ষনের গতিপথ নির্ধারিত হয় । রবীন্দ্রনাথের জীবনে ও তাই হয়েছিল। ঠাকুর পরিবারে ব্রাহ্মধর্মের আবহ , পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাধ্যমে উপনিষদ পরিচিতি , দেশ- বিদেশ ভ্রমণ, জমিদারি তদারকি, কাছে থেকে নিম্নবর্গের মানুষের জীবন প্রত্যক্ষণ, কৃষি উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ, বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক অনটন ,স্বদেশী আন্দোলন ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় তাঁর অবস্থান, সর্বোপরি ঠাকুরবাড়ির মৃত্যুর মিছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিল। তাই রবীন্দ্রনাথের জীবন দৃষ্টি আলোচনা করতে গেলে বিচ্ছিন্ন কিছু সাহিত্য কর্মের আলোকে তা করা যেতে পারে।

বেশিরভাগ ধর্মীয় বিশ্বাস গড়ে উঠেছে হয় পরকাল বা আত্মার পুনর্জন্ম অথবা পরবর্তীকালে দেহের পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস রেখে । রবীন্দ্রনাথ জন্মান্তরে বিশ্বাস করতেন না। ‘পথের সঞ্চয়’ এ এর উল্লেখ করেছেন এভাবে ; “আমার জীবন ধারার মাঝখানে এই মানবজন্মটা একেবারেই খাপছাড়া জিনিস । ইহার আগেও এমন কখনো ছিল না , ইহার পরেও এমন কখনো হইবে না।”

রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্য সাধনার মূল মন্ত্র ছিল সত্য ও সুন্দরের আরাধনার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানো। পরমপুরুষের সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে পরম সুখের সন্ধান করেছেন তিনি । এটা অনন্ত জীবনের ইঙ্গিতবাহী। এ কারণেই হয়তো তিনি বলতে পেরেছেন,

“ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা
প্রভু তোমার পানে।
হে বন্ধু মোর হে অন্তরতর,
এ জীবনে যা কিছু সুন্দর।
সকলই আজ বেজে উঠুক সুরে
প্রভু তোমার গানে।”
(গান-৯৪, পর্ব :পূজা, গীতবিতান)

রবীন্দ্রনাথের দর্শন চেতনায় ঈশ্বরের মূল হিসাবে মানব সংসারকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ দেব বিগ্রহের পরিবর্তে মানুষ ঈশ্বরের পূজার কথা বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের “শিশু তীর্থ” কবিতার উল্লেখ করা যায় । এই দীর্ঘ কবিতার যাত্রাপথে কবি মানুষের জয়গান গেয়েছেন। যা তাঁর জীবন দৃষ্টিকে প্রতিফলিত করে।

“পরস্পরকে তারা শুধায় কে আমাদের পথ
দেখাবে।
পূর্ব দেশের বৃদ্ধ বললে,
আমরা যাকে মেরেছি সেই দেখাবে।
সবাই নিরুত্তর ও নতশির।
বৃদ্ধ আবার বললে ,সংশয়ে তাকে আমরা
অস্বীকার করেছি,
ক্রোধে তাকে আমরা হনন করেছি,
প্রেমে এখন আমরা তাকে গ্রহণ করব,
কেননা মৃত্যুর দ্বারা সে আমাদের সকলের
জীবনের মধ্যে সঞ্জীবিত
সেই মহা মৃত্যুঞ্জয়।
– – – – – – – – – – – – – –
কবি দিলে আপন বীণার তারে ঝংকার ,গান
উঠিল আকাশে- –
জয় হোক মানুষের, ওই নবজাতকের, ওই
চির জীবিতের ।”

১৯৩৬ সালে লিখিত পত্রপুটের অন্তর্গত “পৃথিবী” কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের জীবন দৃষ্টিকে অনেকটা প্রতিফলিত করে। কবি পৃথিবী নামক গ্রহের মহাপরিক্রমার কথা বলেছেন এখানে। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মিলন , প্রেম-বিরহ ও সৃষ্টিশীল গ্রহের যেখানে তিনি আঘাতে ক্ষতবিক্ষত যেমন হয়েছেন তেমনি আবার দানে পরিপূর্ণ হয়েছেন। ঋতু পরিক্রমায় পৃথিবীর ধ্বংসাত্মক নিষ্ঠুর রূপ যেমন প্রত্যক্ষ করেছেন; তেমনি আবার শান্ত আপন রুপেও পেয়েছেন। তাই এই গ্রহের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এজন্যই তিনি বলতে পারেন,

“হে উদাসীন পৃথিবী
আমাকে সম্পুর্ন ভোলবার আগে
তোমার নির্মম পদপ্রান্তে
আজ রেখে যাই আমার প্রণতি।”

পৃথিবীর সম্পর্কে কবির প্রাথমিক উপলব্ধি স্পষ্ট হলেও ধীরে ধীরে সেই ধারনায় সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। নৈবেদ্যর ‘জন্ম’ কবিতায় তাই তিনি বলেন,

“যখনই নয়ন মেলি নিরখিনু ধরা
কনক কিরণ গাঁথা নীলাম্বর -পরা,
নিরখিনু সুখে-দুখে খচিত সংসার-
তখনই অজ্ঞাত এই রহস্য অপার।”

এই অপার রহস্যের ভেদ কবি নিজেই করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ১৩৪৮ সালের ভাদ্রে প্রকাশিত ‘শেষলেখা ‘ র শিরোনামহীন ১১ নং কবিতায় কবি লিখছেন,

“রূপ নারানের কূলে
জেগে উঠিলাম,
জানিলাম এ জগৎ
স্বপ্ন নয়।”

আঘাতে -আঘাতে , বেদনায় -বেদনায় , তিনি এই বাস্তবের কঠিন পৃথিবীকে যেমন চিনতে পারছেন, তেমনি নিজেকেও চিনছেন । তাইতো ‘ক্ষণিকা ‘কাব্য গ্রন্থের “বোঝাপড়া” কবিতায় বলতে শুনি-

“মনরে আজ কহ যে,
ভালো -মন্দ যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।”
সংসারের যাবতীয় দুঃখ-গ্লানি ,হতাশা ,অপ্রাপ্তিকে পাশ কাটিয়ে জীবনকে সহজ সুন্দর করে গ্রহণ করার বার্তা আমরা পাই দু’টি কবিতায়-

“দুর্লভ এ ধরনীর লেশতম স্থান,
দুর্লভ এ জগতের ব্যর্থতম প্রাণ।
যা পাইনি তাও থাক, যা পেয়েছি তাও,
তুচ্ছ বলে যা চাইনি তাই মোরে দাও।”
(দুর্লভ জন্ম)
আবার,
“মাঝে মাঝে বটে ছিড়েছিল তার,
তাই নিয়ে কেবা করে হাহাকার-
সুর তবু লেগেছিল -বারে বার
মনে পড়ে তাই আজি।
কি পাইনি তারি হিসাব মিলাতে
মন মোর নহে রাজি।
আজ হৃদয়ের ছায়াতে আলোতে
বাঁশরী উঠেছে বাজি,
কি পাইনি।”
(গান:৪৪, পর্ব:বিচিত্র, গীতবিতান)

‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে ‘আবু সায়ীদ আইয়ুব’ লিখছেন , “প্রাচীন পারস্য মতে এ জগত শুভাশুভ শক্তিদ্বয়ের দ্বন্দ্বক্ষেত্র । মানুষকে তারা আহ্বান করেছিলেন শুভ দেবতার পক্ষে এই সৃষ্টি যুদ্ধে যোগ দেবার জন্য । রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন ব্রহ্মের কঠোর তপস্যা । এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে জড় থেকে প্রাণ ও মনের দিকে , অশুভ থেকে শুভের দিকে, অপূর্ণ থেকে পূর্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ।” রবীন্দ্রনাথের নিজের জীবন যাপনেও এর প্রকাশ লক্ষণীয় । জীবদ্দশায় প্রায় চল্লিশ জন স্বজনের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করলেও আপাতভাবে তিনি নির্লিপ্ত ছিলেন । ঋষির মতো জীবন যাপন করেছেন। সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে ব্যপৃত রেখেছেন । জীবনকে সহজ সুন্দরভাবে গ্রহণ করেছেন । আর তাই তো নিজের জন্মদিন নিজে উদযাপন করার সাহস দেখিয়েছেন । জন্মদিন উপলক্ষে কবির নয়টি কবিতা (নবজাতক, সেঁজুতি, শেষলেখা ,জন্মদিনে ও পূরবী কাব্যগ্রন্থে) ও একটি গানের উল্লেখ পাওয়া যায়।

স্ফুলিঙ্গের ৮৮ নং, কবিতাটি মনে করিয়ে দেয় কবি নিজের জন্মদিন তথা জীবনকে কিভাবে গ্রহণ করেছিলেন,

“জন্মদিন আসে বারে বারে
মনে করাবারে– –
এ জীবন নিত্যই নুতন
প্রতি প্রাতে আলোকিত
পুলকিত
দিনের মতন।”

১৩৪৫ সালের২৫’ বৈশাখ নিজের জন্মদিনে কবি রেডিওতে পাঠ করছেন জীবন ও জগতকে সহজভাবে গ্রহণ করবার এক অমোঘ বাণী—

“আজি মম জন্মদিনে
সদ্যই প্রাণের প্রান্তপথে
ডুব দিয়ে উঠেছে সে বিলুপ্তির অন্ধকার হতে
মরণের ছাড়পত্র নিয়ে।”
(সেঁজুতি)

জীবন ও জগৎ কে সহজভাবে গ্রহণ করবার চূড়ান্ত প্রকাশ আমরা লক্ষ্য করি সেই বিখ্যাত ও বহুচর্চিত জন্মদিনের গানটিতে। যেটি গীতবিতানের আনুষ্ঠানিক সংগীত পর্বের ১৭ নং গান হিসেবে স্থান পেয়েছে।

” হে নূতন
তোমার প্রকাশ হোক কুজ্ঝটিকা করি উদঘাটন
সূর্যের মতন
হে নূতন
রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
ব্যক্ত হোক জীবনের জয়
ব্যক্ত হোক তোমার মাঝে অসীমের চিরবিস্ময়
– – – – – – – – – – – – – – – – – – –
চির নূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।”

গানটিতে ভালোবাসার অনুরণন রয়েছে। এই ভালোবাসা নিজেকে ভালোবাসার, জীবনকে ভালোবাসার। এভাবেই তিনি নতুন কে আহবান করছেন , জন্মদিনকে আহবান করছেন এবং নূতন এর মাধ্যমে জীর্ণতার অবসান চাচ্ছেন। এটিই বোধ করি রবীন্দ্রনাথের জীবন দর্শন।

 

 লেখক: অধ্যাপক মো. আব্দুল হাই
  ১০.০৫.২০২১
বগুড়া , বাংলাদেশ।